এমপির ধমকের অপেক্ষায় বাদল

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৭ পিএম, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার

এমপির ধমকের অপেক্ষায় বাদল

ইতিহাস কথা বলে। যতবার বিপথে যাওয়ার চেষ্টা করেছে ততবার লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। যতবার মাথাচাড়া দিয়ে উলটপালট করার চেষ্টা করেছে ততবার হুংকারে দমে গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল। লাঙ্গল মার্কা এই নেতা বার বার টালমাটাল বক্তব্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমানের রোশানলে পড়েছেন। এবারো এই নেতা এমপি সেলিম ওসমানের সমর্থিত প্রার্থীকে ড্যামকেয়ার করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফজর আলীকে সমর্থন দিয়ে মাঠে নেমেছেন। ফজর আলীর পক্ষ নিয়ে এমপি সেলিম ওসমানের প্রার্থী জসিমউদ্দিনকে ডাউন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এতে ফের পুরনো ইতিহাসের কথা উঠে আসছে। এমপি সেলিম ওসমানের সেই চিরাচরিত ধমকের অপেক্ষায় রয়েছে বাদল গুঞ্জন উঠেছে। তবে সেই ধমক কবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আদৌ এরুপ কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে বোদ্ধামহলের মতে, বিগত সময়ের মত এবারো এমপি সেলিম ওসমানের ধমকের পরে শুধরাবে শহীদ বাদল। এর আগে উলটপালট বক্তব্য সহ নানা কর্মকা- চলমান থাকবে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। এক পর্যায়ে বিগত সময়ের মত এমপি সেলিম ওসমানের হুংকারে থমকে দাড়াবে বাদল। ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে।

গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে আওয়ামীলীগ নেতা জসিমউদ্দিনের পক্ষে সমর্থন দিয়ে চেয়ারম্যান পদে চেয়েছেন এমপি সেলিম ওসমান। গত ১২ ফেব্রুয়ারী গোগনগরে এক আলোচনা সভায় তিনি প্রকাশ্যে এ ঘোষণা দেন। তবে এই ঘোষণার পর থেকে জসিমউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফজর আলীর অনুগামীরা এই সিদ্ধান্ত মানিনা মানিনা বলে মিছিল করেছেন। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে এর বির্ধোীতা করে আসছেন।

এসব ঘটনার মধ্যে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল ফজর আলীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে মাঠে নেমেছেন। গত ২৪ আগস্ট শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে ফজর আলীকে সমর্থন দিয়ে তার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। বাদল বলেছেন, ‘আপনার ভোট আপনার আমানত। তবে সেই ভোটটা আমি নৌকা মার্কায় চাই। সেই ভোটটা আমি ভাল মানুষের জন্য চাই। ফজর আলীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এই ভাল মানুষকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। হাত উচিয়ে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ এই ভাল মানুষকে আপনারা জয়যুক্ত করুন।’ এসময় বক্তব্যের বিভিন্ন সময়ে ফজর আলীকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছে।

এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারী মতবিনিমিয় সভায় জসিমউদ্দিনকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সেলিম ওসমান বলেন, আপনারা যদি আমাকে একজন সঠিক মানুষ দিতে চান তাহলে জসিম উদ্দিনকে পাস করাবেন। আমার একজন মানুষ চাই সেই মানুষটির নাম জসিম উদ্দিন।

তবে এই সিদ্ধান্তকে মানতে নারাজ প্রয়াত চেয়ারম্যান নওশেদ আলীর ছোট ভাই ফজর আলী। তিনি ইতোমধ্যে মিছিল পর্যন্ত করেছেন। এ ব্যাপারে ৫ মার্চ বন্দরে এক জনসভায় এমপি সেলিম ওসমান বলেন, গোগনগরে নওশেদ আলী মারা গেছেন। ওই জায়গায় আমি জসিম উদ্দিনকে নির্বাচন করতে অনুরোধ করেছি। তবে সব জায়গায়ই বান্দর থাকে, শয়তান থাকে। এক আলীর পরিবর্তে আরেক আলী হবে এটা হয়না। আমি ওই এলাকায় মিটিং করেছি। আমি জনগনের কাছে জসিম উদ্দিনকে চেয়েছি। আমি তাকে নমিনেশন দেই নি। আমি মিটিং করে বেরিয়ে আসার পরে কিছু ছেচকা ছুকরা নিয়ে উনি মিটিং করলেন মানিনা মানবো না। তোমার যদি এতোবড় কলিজা ছিল তাহলে তুমি জনসভার মধ্যে এসে বললে না কেন? এরপর দেখলাম উনি আমার এবং আমার ছোট ভাইয়ের ছবি দিয়ে নির্বাচনী পোষ্টার লাগিয়েছেন। এর আগে আমার ছবি দিয়ে পোষ্টার করায় আমার অনুমতি ছাড়া আমি কিন্তু তার বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তার সাথে তিনজন মেম্বার সহযোগীতা করছেন। যার বাড়ির একটা বউ জাপানে একটা ফিলিপাইনে আরেকটা বলে নারায়ণগঞ্জে। বিশাল বিশাল বিল্ডিং বানাইছেন নারায়ণগঞ্জে এলাকার জন্য ১০টা পয়সা খরচ করেন নাই। উনার ভাইয়ের যে অবদান তার বিনিময়ে উনি আজকে চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। এলাকার মানুষ ওটাকে গ্রহন করবেনা। কারন ওই এলাকার সাধারণ মানুষ আমাকে ভালবাসে।

এভাবে যখন এমপি সেলিম ওসমান ফজর আলীর বিরোধীতা করে বক্তব্য দিয়েছে তখন জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারীর সাথে তার ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তাছাড়া সেলিম ওসমান যখন জসিমউদ্দিনকে চেয়ারম্যান করার ব্যাপারে সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন তখন বাইপাস করার চেষ্টা করছে স্নেহের ভিপি বাদল।
এখানে উল্লেখ্য যে, ওসমান পরিবারের হাত ধরে রাজনীতিতে নানা অর্জনের পাশাপাশি জেলা যুবলীগের ও পরে জেলা আওয়ামীলীগে সাধারণ সম্পাদকের পদও পেয়েছেন। নেতৃত্বের শীর্ষে অবস্থান করে বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন। আর সেই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কথাও বলছেন। একারণে বাদলের কিছু গোপন ফাঁস করেছেন এমপি সেলিম ওসমান বলেছেন, ভিপি বাদল চাঁদপুর জেলার মতলব থেকে এসে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। তিনি এবার সেটা দেখে নিবেন। একই সময়ে সেলিম ওসমান ছোট ভাই এমপি শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করে এও বলেন, একজন এমপির আশীর্বাদে বাদল এখন নেতা বনে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফরাজিকান্দা গুডলাক ক্লাবের আয়োজনে গত ২৯ জুন বৃক্ষরোপণ ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এক পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, ‘বন্দরে আওয়ামী লীগের কোনো এমপি নেই। বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রশিদ ভাই বন্দরের এমপি।’

এর জবাব দিতে গিয়ে গত ২ জুলাই শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় এমপি সেলিম ওসমান বলেন, ‘আজকে একটি পত্রিকায় দেখলাম আমার ছবি সহ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বন্দরের একটি ঘটনায়। তিনি চাষাঢ়া রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে থাকতেন। একজন এমপি সাহেবের আশীর্বাদে ওনি বলে এখন লেতা (নেতা)। ওনি নাকি এখন লেতা। এ লেতা বন্দরে গিয়ে বললো, ‘সেলিম ওসমান বন্দরের এমপি না। বন্দরের উপজেলা চেয়ারম্যান বন্দরের এমপি। প্রশ্ন থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এমপি সিট বদলায় দিতে পারে এটি কি করে সম্ভব হতে পারে। দুই দিনের যোগি না ভাতেরে অন্য বইলেন না। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। হাজার বার বলি সেলিম ওসমানের থাবা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। বাঘের চেয়েও ভয়ংকর সেলিম ওসমানের থাবা।’

এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগ মুহূর্তে নৌকা প্রতিকের দাবী নিয়ে শামীম ওসমানের বড় ভাই সেলিম ওসামনের বিরোধীতায় মাঠে নেমেছিলেন। ওই বছরের ১৭ এপ্রিল মুজিব নগর দিবসের আলোচনা সভায় দলীয় কার্যালয়ে বক্তব্য প্রদানকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো: শহীদ বাদল সেলিম ওসমানকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন ‘গার্মেন্টসে বসে আসন ভাগাভাগির ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে, নারায়ণগঞ্জে লাঙ্গলকে কোন আসন ছাড় দেয়া হবে না, সকল আসনেই নৌকার প্রার্থী দিতে হবে’
এই মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সেলিম ওসমান শহীদ বাদলকে স্নেহের বাদল উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমার দাদা খান সাহেব ওসমান আলী প্রায়শই একটি কথা বলতেন। আমার দাদার সেই কথাটিই বলছি ‘আগের দিন আর নাইরে নাতি, খাবলাইয়া খাবলাইয়া খাতি’। তিনি আরো বলেন, ‘বাদল দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাথে থেকে তাঁর কাছ থেকে উন্নয়নের রাজনীতি শিখতে পারেনি। তিনি দলে বিভেদ সৃষ্টি করার রাজনীতি শিখেছেন। আমি মনে করি বাদলকে উন্নয়নের রাজনীতি শিখতে হলে আগে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ কলেজের তহবিলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া দরকার। যে প্রতিষ্ঠানটিতে উনি দীর্ঘ সময় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। উনি সরকারী তোলারাম কলেজের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেডে আমার ছোট ভাই শামীম ওসমানের থেকেও ভিপি বাদলের যাতায়াত বেশি ছিল।

সেলিম ওসমানের এই বক্তব্যের পরই বাদল তার বক্তব্য থেকে সরে আসেন। তবে এই ঘটনা বেশিদূর না আগালেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের বিপরীতে গিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদল ও তার স্ত্রী কেন্দ্রীয় মহিলা লীগ নেতা নাহিদা হাসনাত। কিন্তু শেষতক তারা কেউ মনোনয়ন পায়নি।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও