ভোটের মাঠে বিতর্কিতরা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০৩ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার

ভোটের মাঠে বিতর্কিতরা

ভোটে অংশ নেয়া দেশের সকল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। আর এই ভোটের লড়াইয়ে সেই জয়ী হয় যিনি বেশীরভাগ মানুষের মন জয় করে নিতে পারেন। অধিকাংশ মানুষ যেই প্রার্থীর উপর ভরসা লাভ করতে পারে তাকেই ভোট দেয় ভোটাররা। সেই গণতান্ত্রিক কারণেই ভোটের মাঠে লড়াই করতে পারে বিতর্কিত ব্যক্তিরাও। কিন্তু তাদের উপস্থিতিতে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটাররা কয়েকবার ভেবে নেন। কারণ ত্রাসের রাজত্ব করে আসা এসব ব্যক্তিরা ভোটের দিন থেকে শুরু করে সবসময়েই আতঙ্ক বিরাজ করে রাখেন সাধারণ মানুষের মনে।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এমনই ব্যক্তিরা আবারও সরব হতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু ইউনিয়নে এমন ব্যক্তিদের নতুন করে সরব হওয়ায় সভ্য রাজনীতি করে আসা ব্যক্তিরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। এসব ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নিলে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকবে কিনা তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। সাধারণ ভোটাররা তাদের ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কিনা সেই সন্দেহও রয়েছে ঢ়ের।

তবে রাজনীতিবিদদের মতে, বিতর্কিত ব্যক্তিরা কোনক্রমেই একা নন। তাদের পেছনে থাকে জেলা কিংবা মহানগর পর্যায়ের বড় কোন নেতার আশীর্বাদ। আর সেই সুযোগেই ধীরে ধীরে নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন বিতর্কিতরা। নির্বাচনের মৌসুম ঘনিয়ে আসলেই শুরু হয় তাদের দৌড়ঝাঁপ।

তেমনই একজন ফজর আলী। সম্প্রতি সাংসদ সেলিম ওসমান কঠোর ভাষায় সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম নওশেদ আলীর ছোটভাই জাপান, ফিলিপাইন প্রবাসী ফজর আলীর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যারা বিদেশে থাকে জাপানে একবউ, ফিলিপাইনে একবউ ও দেশে একবউ এদের ভোট দিবেননা। শহরে বড় বড় ভবনের মালিক হয় কিন্তু এলাকার জন্য কিছু করেনা এমন ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি বানাবেননা। তখন উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ করতালি দিয়ে সেলিম ওসমানের বক্তব্য স্বাগত জানায়। এমন বিতর্কিত ফজর আলী জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার আর্শীবাদ নিয়ে নির্বাচনের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে।

কুতুবপুরে মিরু ও তার বাহিনীকে চিনে না এমন কেউ নেই। ডিশের ব্যবসা থেকে তার সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু হয়। ওসমান পন্থী ট্যাগ লাগিয়ে পাগলা-কুতুবপুর এলাকায় গড়ে তুলেছে তার বিরাট সন্ত্রাসী বাহিনী। বিভিন্ন সময় মারামারি, হত্যাকান্ড, কুপিয়ে জখমের অভিযোগ উঠলেই খোঁজ পাওয়া যায় মিরু বাহিনীর সদস্যের নাম। এসপি হারুনের আমলেও এই মিরু গ্রেপ্তার হয়েছিলো পুলিশের জালে। সেই মিরুও এবার কুতুবপুরে চেয়ারম্যান পদের জন্য উঠে পরে লেগেছে। মীরুর বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা, মারামারি ও চাঁদাবাজী মামলাসহ সর্বমোট ১৯ মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে অর্ধশত। পাগলা বউ বাজার ও শাহী মহল্লার মাদকসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করতে মীরুর রয়েছে বিশাল বাহিনী। মীরু এক মূর্তমান আতঙ্ক। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও রয়েছে। মাদক ব্যবসার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি মীরু।

সদর উপজেলার আলীরটেকে আওয়ামী লীগের হাইব্রিড নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত সায়েম। দল ক্ষমতায় আসার পরেই নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি দেখিয়ে সরব হন বিভিন্ন সময়। নিজের প্রভাব বোঝাতে খোদ মামলা করেছেন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। সেই সায়েমও এবার নির্বাচন করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। শুরু করেছেন বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ ও লবিং।

ইউপি নির্বাচনের পাশাপাশি নাসিক কাউন্সিলর পদেও বিতর্কিতদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। বন্দরে তেমনই একজন যুবলীগ নেতা খাঁন মাসুদ। বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কার্যক্রম চালিয়ে আলোচনায় থেকেছেন তিনি। সাংসদ শামীম ওসমানের বলয়ে রাজনীতি করায় ভাবেন ৭ খুন মাফ। তার বিশাল বাহিনীর পাশাপাশি রয়েছে মাসিক বেতনভুক্ত বিশেষ পেশার ব্যক্তিরাও। অথচ ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী নারায়নগঞ্জের বন্দরে ছাএলীগ ক্যাডার খান মাসুদকে ৬ রাউন্ড গুলি ভর্তি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-১১। এসময় খান মাসুদের আস্তানা থেকে গুলিভর্তি বিদেশী পিস্তল ছাড়াও মদ, বিয়ার, গান পাউডার উদ্ধার করেন। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারী বন্দর সেন্ট্রাল খেয়া ঘাট সংলগ্ন ময়মনসিংহ পট্টির সামনে বালু সন্ত্রাসী চাঁন মিয়া ও ছাত্রলীগ নেতা খান মাসুদ বাহিনীর মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় চাঁন মিয়া তার লাইসেন্স করা শর্টগান নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেন। ওই সময় খান মাসুদ বাহিনীর হাতেও অস্ত্র ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

সোনারগাঁ উপজেলার বারদী ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া গ্রামের লায়ন বাবুল ও তার পরিবারের সদস্যদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ার ঘটনা বেশীদিনের নয়। গত বছরের ২৬ অক্টোবর জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে প্রচারিত হয় তার অপকর্মের বিষয়। সাধারণ মানুষের জমি দখল থেকে শুরু করে নিরীহ মানুষকে মারধরসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। কেউ এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন, হামলা, মামলা এমনকি প্রাণনাশের হুমকি।

সোনারগাঁ উপজেলার যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম নান্নুর বিরুদ্ধে জায়গা জমি দখলের বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। নিজ এলাকা পেরিয়ে মেঘনা উপজেলাতে গিয়ে তার জমি দখলের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। তবে সেই অভিযোগের প্রতিবাদে চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সভা করেন।

মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের আগামী নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের লড়াইয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সোহাগ রনি। মূলত সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নারীসহ আটক করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার পর থেকে নৌকা প্রতীক পেতে আরো সরব হয়ে উঠেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতিতে বিতর্কিতদের মাথায় তুলে রাখার পরিণাম কখনই ভালো হয়নি। নারায়ণগঞ্জে বিতর্কিত নেতাদের চাইতে তুলনামূলক স্বচ্ছ এবং ভদ্র নেতাদেরকেই বার বার পুরস্কৃত করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু কোন কারনে কেন্দ্রকে ভুল বুঝিয়ে যদি বিতর্কিতদের নমিনেশন দেয়া হয় তাহলে তার পরিনতি দলের জন্যেই বিপদ ডেকে আনব।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও