চার নেতাই বসছেন চার চেয়ারে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫৮ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ বুধবার

চার নেতাই বসছেন চার চেয়ারে

রাজনীতিতে পরিবর্তনের কথা বলে অনেকে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও বাস্তব চিত্র উল্টো দৃশ্যপঠের ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে। কেউ কেউ আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে পরিবর্তনের মালা জপতে শুরু করেছে। তবে রাজনীতিক বিশ্লেষকদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও রাজনীতিক সূত্রগুলো চার নেতাকে ঘিরে আওয়ামীলীগের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার কথা বলছে। সেই সূত্র অনুযায়ী ফের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদে বহান থাকবে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। একইভাবে জেলা পরিষদের চেয়ারে বহাল থাকবেন মহানগর আওয়ামীলীগের বর্ষিয়ান নেতা আনোয়ার হোসেন। এছাড়া জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি পদে বহাল থাকবেন বর্তমান সভাপতি আব্দুল হাই। তবে কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেক্রেটারী পদ পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপুর। গতকাল আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নির্বাচনের হাওয়া বইরে শুরু করেছে চারদিকে। আগামী ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়ও জেলা পরিষদেরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই সাথে ডিসেম্বরের আগে সারা দেশে জেলা, উপজেলা সহ ইউনিট পর্যায়ের নতুন কমিটি হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সে হিসেবে অচিরেই নির্বাচনের পাশাপাশি আওয়ামীলীগের কমিটি নিয়েও তোড়জোড় শুরু হবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরিবর্তন চাইছেন একাংশের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, সহ সভাপতি চন্দনশীল, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল। বিভিন্ন ইস্যুতে সভা সমাবেশ করে পরিবর্তনের গান গেয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে সরাসরি মেয়র আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন আবার কেউ কেউ পরোক্ষভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে মেয়র আইভীর পরিবর্তনের কথা বলছেন। সম্প্রতি মহানগর আওয়ামীলীগের উদ্যোগে কর্মী সভাতেও এ ধরনের নানা বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। এর আগে জিউস পুকুর ইস্যু এসব নেতাকর্মীরা মেয়র আইভী বিরুদ্ধে আন্দোলন করে মাঠ গরম করেছিল। এর মধ্যে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র আইভীর নৌকা ঠেকিয়ে খোকন সাহা প্রার্থী হতে চাইছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। একারণে তিনি সবচেয়ে বেশি বিষোদাগার করে যাচ্ছেন।

অথচ মেয়র আইভীকে বিগত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে নৌকা তুলে দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছেন। সেই কথা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন বলে মনে করছেন আওয়ামীলীগের আরেকটি অংশ। তাদের মতে, নৌকা দেয়ার মালিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাহলে শুধু শুধু বিশৃঙ্খলা করে লাভ কি। কিছু কিছু নেতা আছে যারা মাঠ গরম না করলে ভাল লাগেনা, নিজেরা হাইলাইট হতে উলট পালট কথা বলে থাকেন। কিন্তু এতে হিতে বিপরীতও হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র আইভীর স্থানে অন্য কাউকে নৌকার মনোনয়ন দিলে দলের ভেতরে বড় ধরনের কোন্দল সৃষ্টি হবে। তাছাড়া জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকা আইভীকে নৌকা না দেয়ার পক্ষে কোন কারণ নেই। ভোট ব্যাংক যার এতো ভাল তাকে অহেতুক মাইনাস করার যুক্তি নেই। এই অবস্থায় প্রার্থী পরিবর্তন করে ঝুকি নিতে চাইলে বিএনপি সহ অন্য রাজনীতিক দলের শক্তিশালী প্রার্থীরা সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। তাই আপাতত এতো বড় ঝুকি নিবেনা আওয়ামীলীগ। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের রাজনীতি ব্যালেন্স করতে দুই মেরুর কর্ণধারকে দু’পাশের সিংহাসনে বসানো হয়েছে। মেয়র আইভীকে সিটি করপোরেশনের চেয়ারে, অন্যদিকে এমপি শামীম ওসমানকে সংসদ সদস্যের চেয়ারে। যদি মেয়র আইভীকে নৌকার মনোনয়ন না দেয়া হয়; তাহলে রাজনীতিতে ব্যালেন্স থাকবেনা। সে হিসেবেও মেয়র আইভীকে নৌকা দেয়া হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, মেয়র আইভী হাইকমান্ডের গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন। মনোনয়নের কথা বলছেন। সহজ জয়ের সমীকরণ থাকলে দল কোন ঝুকি নিবেনা। তাই ফের মেয়র আইভীকে নৌকার প্রার্থী করতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তের উপর অটল রয়েছে।

২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে মনোনয়ন ইস্যুতে মাঠে নামে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। মেয়র আইভীর বিরোধীতা করে বিষোদগার করেন। তবে শেষতক মেয়র আইভীর হাতে নৌকা তুলে দেয়া হয়। এদিকে আনোয়ার হোসেনকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়। সেই ফর্মূলায় এবার হাটছেন মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা। তিনিও জিউস পুকুর ইস্যু দিয়ে মেয়র আইভী বিরোধীতা শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত বিষোদাগার করে যাচ্ছেন। টার্গেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র আইভীকে বাদ দিয়ে নৌকার মনোনয়ন ছিনিয়ে নেয়া। আর নৌকার টিকিট মানে মেয়র পদে জয় নিশ্চিত। এটা হচ্ছে প্রথম সমীকরণ। আর দ্বিতীয় সমীকরণের হিসেবে যদি কোন কারণে বিগত নির্বাচনের মত এবারো আইভী নৌকা পেয়ে যান তাহলে আনোয়ার হোসেনের মত জেলা পরিষদ কিংবা অন্য কোন দফতরের চেয়ারে বসার। তাই মেয়রের চেয়ারের পরে দ্বিতীয় টার্গেট হিসেবে রয়েছে জেলা পরিষদের চেয়ার। তবে অনিশ্চয়তার কারণে জেলা পরিষদের চেয়ারের দিকে নজর রয়েছে মহানগর আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি চন্দনশীলের।

সূত্র বলছে, জেলা পরিষদের মধ্যে ওসমান বলয়ের অনেক সদস্য রয়েছে। তাদের দিয়ে আনোয়ার হোসেনের বদনাম করতে চাইছেন। কিছুদিন পূর্বে বাজেট সহ নানা ইস্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল সদস্যরা। এছাড়াও আনোয়ার হোসেনকে জেলা পরিষদের চেয়ার একজন সাংসদ সদস্য দিয়েছিল বলেও অনেকে মন্তব্য করছেন। এতে করে সেই চেয়ার ছিনিয়ে নেয়ার মনোভাবও ফুটে উঠেছে ওসমান বলয়ের নেতাকর্মীদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্ষিয়ান এই নেতার দীর্ঘ দিনের রাজনীতিক ক্যারিয়ারে প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য। যেকারণে বিগত নির্বাচনের সময়ে তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বয়সের গন্ডিও পেরিয়ে যাচ্ছে। এই বয়সে তাকে পুরষ্কৃত করতে না পারলে হয়তো আর সময় পাওয়া যাবেনা। অন্যদিকে আওয়ামীলীগের যুবক ও মধ্য বয়সীদের সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। রাজনীতিক এ হিসেবে সবাই পিছিয়ে আছে। তাছাড়া এই চেয়ারে বলয় ভিত্তিক নেতাদের বসালে তা নিয়ে নানা বিশৃঙ্খলা শুরু হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দুই মেরুর কর্ণধার আইভী শামীম ছাড়াও এক সময়ের ত্যাগী নেতাদের তালিকা রয়েছে। সে হিসেবে বর্ষিয়ানদের তালিকায় আনোয়ার হোসেনের নাম রয়েছে। এসব ত্যাগীদের পুরস্কৃত করতে এবারো তাকে জেলা পরিষদের চেয়ারে বহাল রাখা হবে। নতুন কোন বড় কিছুতে পুরস্কৃত করার আগ পর্যন্ত তাকে এখানে রাখা হবে।

সারা দেশের মত নারায়ণগঞ্জ জেলা, উপজেলা সহ ইউনিয়ন কমিটি নতুন করে করার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামীলীগ। সে হিসেবে ডিসেম্বরের আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটির নবায়ন করা হবে। এর মধ্যে জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল হাইকে তার আগের জায়গায় রাখা হবে এবং সেক্রেটারী পদে থাকা আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদলকে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য মাইনাস করে সেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী পরিষদের সদস্য আনিসুর রহমান দিপুকে পদায়িত করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদলের বিরুদ্ধে কমিটি সহ নানা ইস্যুতে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় প্রতি বছর তার বিরুদ্ধে লিখিত অলিখিত ডজন ডজন অভিযোগ জমা হয়েছে। সম্প্রতি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাইকে নিয়েও বিরুপ মন্তব্য করেছেন। যেকারণে এবার তাকে মাইনাস করে দলের ত্যাগী নেতাদের তালিকা থেকে বাছাই করে বাংলাদেশ আওয়ামী পরিষদের সদস্য আনিসুর রহমান দিপুর নাম শোনা যাচ্ছে। প্রথম থেকেই তাকে ঘিরে গুঞ্জন উঠেছিল। এবার সেই গুঞ্জন বাস্তবে রুপ নিতে যাচ্ছে। আর সভাপতি আব্দুল হাই বর্ষিয়ানদের তালিকায় থাকায় আপাতত তাকে এখানে রাখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামীলীগের দুটি কমিটিতে ব্যালেন্স করতে দেখা গেছে বিগত দিনে। তবে এবার সেই ব্যালেন্স কতটুকু দেখা যাবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও বর্তমানে বলয় ভিত্তিক রাজনীতিতে উলট পালট অবস্থা তৈরি হয়েছে। সে হিসেবে কার্যত অর্থে কে কোন বলয়ের লোক তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। এতে করে কমিটিতে ব্যালেন্স করা নিয়েও সংশয় তৈরি হবে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও