পুরো গোষ্ঠী বিএনপির রাজনীতিতে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৫৯ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ রবিবার

পুরো গোষ্ঠী বিএনপির রাজনীতিতে

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। দেশের বিএনপি নেতাদের মধ্যে পরিচিত মুখে বিভিন্ন কারণে। বিশেষ করে প্রায় সময়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শোতে থাকেন তিনি, কলাম লিখেন জাতীয় দৈনিকে। ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে লড়লেও ভোটের মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে গোছল ছাড়াই কোরবানী দেওয়া হয় তাঁকে। ছোট ভাই মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। তাঁর আর বিশেষণ প্রয়োজন হয় না। করোনার সময়ে এক নামে তাঁকে চিনেছে সকলে। নারায়ণগঞ্জের গন্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি সেবা দিয়েছেন, দিচ্ছেন করেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন, সৎকার, হাত বাড়িয়েছেন অসহায়দের জন্য। তবে শুধু তৈমূর ও খোরশেদ না খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তাদের পরিবারের অন্যরাও বিএনপির রাজনীতিতেই সম্পৃক্ত। আর এ দল করতে গিয়ে মামলা হামলা কারাবন্দীর ঘটনার অভাব নাই।

২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার বাইরে পুলিশ তাঁর উপর হামলা করে গলায় চিপ দিয়ে ওসিকে দেখা যায় ধরে নিয়ে যেতে। এর আগেও শহরের দুই নং রেল গেট, খানপুর হাসপাতালের সামনে হরতার চলাকালে পুলিশের আক্রমনের শিকার হন তৈমূর।

তৈমূর আলম খন্দকার : ১৯৫৩ সালের ১৯ অক্টোবর শাহআলম খন্দকার ও রোকেয়া খন্দকারের পরিবারে জন্ম নেন তৈমুর। ইতোমধ্যে বাবা ও মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ভাই বোনদের মধ্যে তৈমূর আলম খন্দকার সবার বড় ছেলে। তৈমূরের বাবা শাহআলম খন্দকার ছিলেন বিলুপ্ত গ্রীন্ডলেজ ব্যাংক এর বাংলাদেশ ও নারায়ণগঞ্জ শাখার ম্যানেজার। ইস্ট পাকিস্তান গ্রীন্ডলেজ ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। শাহআলমের বাবা তোরাব আলী খন্দকার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসী এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তির একজন। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ফাস্ট ক্লাস পান তৈমুর। ৬৯ সালে তোলারাম কলেজে ডিগ্রীতে ভর্তি হয়। এ কলেজে পড়াশোনা কালে সংগঠক হিসেবে নিজেকে জাহির করেন। মাসদাইরে প্রভাতী কল্যাণ সংস্থা, মুসলিম একাডেমী করার পাশাপাশি দিনমজুরদের বিভিন্ন সংগঠনও শুরু করেন। ঠেলাগাড়ি, ভ্যান গাড়ি, রিকশা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ শুরু করেন তৈমূর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। ৭৪ সালে ডিগ্রী পরীক্ষায় সেকেন্ড ক্লাস পায়। পরে তৈমুর ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ ল কলেজে। এ কলেজ থেকে ৭৬ সালে ল পাশ করে ৭৮ সালে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবি সমিতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮২ সালে ঢাকার মগবাজার এলাকার হালিমা ফারজানার সঙ্গে বিয়ে হয় তৈমূর আলম খন্দকারের। ৮৪ সালে তৈমূর চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ব্যারিস্টার পড়াশোনা করে ৩পার্টের মধ্যে পার্ট ১ ও ২ শেষ করেন। ৮৫ সালে দাদা তোরাব আলী মাস্টার মারা গেলে তৈমূর দেশে ফিরে আসলে আর বিলেতে যাওয়া হয়নি। তৈমূর আলম খন্দকারের ২ মেয়ে। বড় মেয়ে ব্যারিস্টার মার ই য়াম খন্দকার বিবাহিত। তিনি এখন বাবা তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গেই কাজ করেন। ১৯৯৬ সালে তৈমূর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হওয়ার ইচ্ছা পোষন করলেও শামীম ওসমানের কারনে তা হয়ে ওঠেনি। পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ওই সময়ে শহরের চাষাঢ়ায় অবস্থিত শহীদ জিয়া হল মিলনায়তনের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন করে আওয়ামী লীগ যার তীব্র বিরোধীতা করেন তৈমূর। একই সময়ে সাবেক এমপি আবুল কালাম নিস্ক্রিয় হলে তৈমূ রকে সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ দেওয়া হয়। শহরের শায়েস্তা খান সড়কে তৈমুরের চেম্বার থাকলেও শামীম ওসমানের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে এক পর্যায়ে ১৯৯৭ সালে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় থেকে হাইকোর্টে আইন পেশা চালিয়ে যান তিনি। ওই সময়ে একটি রাজনৈতিক মামলায় হাইকোট থেকে গ্রেপ্তার হয়ে রাজনীতিতে আলোচনায় ওঠে আসেন। ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একটি মিছিলে গুলি করে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী। ওই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। ঢাকায় অবস্থান করা কালীন ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা ঘটনায় তৈমূর আলমকে আসামী করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি-জামাত জোট সরকার তৈমূর আলম খন্দকারকে বিআরটিসির চেয়ারম্যান বানায়। এর আগে তিনি ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। ২০০৩ সালে তৈমূরকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ২০০৭ সালে ওয়ান এলেভেনের পর বিএনপির বর্তমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলে প্রথমবারের মত তার আইনজীবি হিসেবে আইনী লড়াই চালিয়েযান তৈমুর। পরে ওই বছরের ১৮ এপ্রিল যৌথবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করে যার মধ্যে একটি মামলায় ১২ বছরের জেল হয়। ২০০৯ সালের মে মাসে মুক্তি পান তৈমুর। ওই বছরের জুন মাসে তৈমুরকে আহবায়ক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। বছরের শেষের দিকে ২৫ নভেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে তৈমুর হন জেলা বিএনপির সভাপতি। একই সঙ্গে তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা ১৮দলীয় ঐক্য জোটের আহবায়ক করা হয়। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন তৈমুর। বিএনপি প্রথম দিকে তাকে সমর্থন দিলেও ভোটের মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশে তিনি নির্বাচন থেকে সরে আসেন।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর তৈমূর আলম খন্দকারের রূপসীর বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মাহামুদুর রহমান মান্না সহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। হামলাকারীরা রামদা, চাপাতি ও লাঠিশোঠা নিয়ে এসেছিল বলে অভিযোগ করেছেন তৈমুরের মেয়ে মার-ই-য়াম। তিনি বলেন, ‘সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিতে দিতে তাদের বাড়ির দিতে আসতে থাকে। তারা বিনা উষ্কানিতে হামলা করে।’

মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তিন বারের নির্বাচত কাউন্সিলর। ২০০৩ সালে শুরু পৌরসভার নির্বাচন দিয়ে। এর পর আর তাকে পেছনে ফিরতে হয়নি। পরের ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে খোরশেদ এখন সারাদেশে একটি আলোচিত নামে পরিণত। করোনার ভয়াবহতা বাড়তে শুরু করলে দাফন, সৎকার থেকে শুরু করে সবকিছুতেই এগিয়ে ছিলেন খোরশেদ। তখন থেকেই তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকেন। প্রচারণা করেন ব্যক্তি খোরশেদের। আর অল্পদিনেই বনে যান ‘করোনা হিরো’ আর ‘করোনা বীর’ সহ নানা উপাধিতে।

করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গে মৃত ব্যক্তিদের লাশ পড়েছিল বাড়ির আঙিনায়, সিঁড়িতে। সংক্রমণের ভয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা কেউ লাশ দাফনে এগিয়ে আসেনি। ওই পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাশ দাফন ও সৎকারে এগিয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। মাকসুদুল ও তাঁর দল টিম খোরশেদ একে একে দেড় শতাধিক জনের লাশ দাফন করেন। মৃতদেহ সৎকারে মুখাগ্নি করেছেন কয়েকজনের। করোনার শুরু থেকে হ্যান্ডস্যানিটাইজার তৈরী ও বিতরণসহ নানা উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জবাসীর পাশে ছিলেন আলোচিত এই কাউন্সিলর।

মাকসুদল আলম খন্দকার খোরশেদকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেন ডাচ রাজনীতিবিদ জোরাম জারন ভ্যান ক্লাভেরেন। তিনি ফ্রিডম পার্টির সদস্য হিসাবে তিনি ২০১০ সালের ১ জুন থেকে ২০১৪ সালের ২১ মার্চ অবধি নেদারল্যান্ডের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন।

খোরশেদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৪৯টি। বিগত দিনে হরতাল অবরোধ চলাকালে সামনের সারিতে থাকা এ যুবদল নেতাকে এখন পর্যন্ত কারাবন্দী হতে হয়েছে ১০ বারের মত। এছাড়া জেল গেট থেকেও গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকবার। মহানগর যুবদলের সেক্রেটারী থেকে সভাপতির দায়িত্ব পালন কালে খোদ প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিরাও তাঁর সক্রিয়তাকে স্বীকার করেছেন।

মার-ই-য়াম খন্দকার : তৈমূর আলমের কন্যা ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকার নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। ২০২০ সালের ১৪ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে সদস্য পদে জয়ী হয়েছিলেন ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকার। আইন পেশার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষদের আইনগত অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা অন্ধ কল্যাণ সমিতির সহ সভানেত্রী হিসেবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে শ্রমিক রাজনীতির উপর মালেশিয়া থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

দুই ভাগ্নে : তৈমূরের ভাগ্ন রাশিদুর রহমান রশো এক সময়ে ছাত্রদলের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ কলেজ শাখার যুগ্ম আহবায়ক ও পরে সভাপতি হন। ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জ থানা ছাত্র দলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক, পরে তিনি মহানগরের যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা চলমান রয়েছে। কারাভোগ করেছেন ৯ বার। ২০১৪ সালের গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ ৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন রশু। এরপর নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানার মামলায় টানা চারবার জেলগেট থেকে গ্রেফতার এবং অনেকবার রিমান্ডে গিয়েছেন। এছাড়া আরেক ভাগ্নে মাহাবুবুর রহমান ছিলেন মৎসজীবী দলের নেতা। তিনিও একাধিক মামলার আসামী।

পরিবারের অন্যরা : খোরশেদের শ্বশুর আলেয় আলম খন্দকার একই সঙ্গে তৈমূর আলম খন্দকারের চাচাতো ভাই। তাঁর বাড়িতে মূলত বিএনপির তারাব কমিটি গঠন হয়েছিল। মতিন চৌধুরীর অনুগামীদের মধ্যে তিনি ছিলেন বেশ বিশ্বস্ত। সে কারণে তাকে বিলুপ্ত তারাব ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি করা হয়।

চাচী শাহীনা আক্তার রেহেনা ছিলেন তারাবো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। মতিন চৌধুরীর আমলে তিনি রূপগঞ্জ থানা মহিলা দলের সেক্রেটারী ছিলেন। মাতুয়াইল ইউনিয়নের টানা ২৫ বছরের চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর বাবা আবদুল্লাহ মোল্লা। এ আবদুল্লাহ মোল্লা ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচরদের একজন। জাগো দল হতেই তিনি ছিলেন জিয়ার সঙ্গে।

তাফসির আলম খন্দকার ছিলেন তারাব পৌর বিএনপির ৪নং ওয়ার্ড কমিটির সদস্য। পরে ২০০১ হতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। মোহসীন ভূইয়া ছিলেন তারাব পৌর মৎসজীবী দলের নেতা। এছাড়া জয়নাল আবেদীন হলেন জেলা কৃষক দলের সেক্রেটারী।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও