নাশকতা জ্বালাও পোড়াওয়ের খলনায়ক এখন এক নাম্বার আওয়ামী লীগার

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৩৫ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০২১ বৃহস্পতিবার

নাশকতা জ্বালাও পোড়াওয়ের খলনায়ক এখন এক নাম্বার আওয়ামী লীগার

একেএম শামীম ওসমান। কোন বিশেষণ প্রয়োজন হয় না নামের আগে পরে। সকলেই তাঁকে চিনেন। আওয়ামী লীগের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। তাঁদের দাদার বাড়ি চাষাঢ়ায় বায়তুল আমানে যাতায়াত ছিল বঙ্গবন্ধুর। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে একাধিকবার উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জ, বায়তুল আমান, খান সাহেব ওসমান আলী, একেএম সামসুজ্জোহার নাম। ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার পর শামীম ওসমানের বাবা একেএম সামসুজ্জোহাকে মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে খন্দকার মোশতাকের কথায় রাজী না হওয়ায় কারাবরণ করতে হয়েছিল। মোশতাকের সেই প্রস্তাবের টেলিফোনটি রিসিভ করেছিলেন প্রথমে শামীম ওসমান। তিনি সেই ইতিহাস প্রায়শই বয়ান করেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন লংমার্চ ঠেকিয়ে দলের ভেতরে প্রিয়পাত্র আর দলের বাইরে সমালোচিত হন। ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়ায় বোমা হামলায় আহত হন তিনি, মারা যান ২০জন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা শামীম ওসমান প্রায়শই রাজনীতিতে অপর নেতাদের সিএস আরএস তথা গোড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। কথা বলেন খন্দকার মোশতাকের ইস্যু তুলে। নারায়ণগঞ্জের কোন কোন নেতা খন্দকারের মোশতাকের প্রেতাত্মা বলেও গালি ছুড়েন। বক্তব্যে উঠে আসে দলপ্রীতির কথা। প্রধানমন্ত্রীর পাশে থাকা, ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করার আহবান, আকুতি থাকে কণ্ঠে। কখনো দীপ্তকণ্ঠে কখনো নিচুস্বরে। দোর্দন্ড দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করা শামীম ওসমানের এলাকাটি নারায়ণগঞ্জ-৪ যেখানে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানা এলাকা। কেউ তাকে ডাকেন ‘নারায়ণঞ্জের সিংহপুরুষ’। কেউ বলেন আধুনিক নারায়ণগঞ্জের রূপকার। আর ফতুল্লা থানার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কুতুবপুর। সেই কুতুবপুরে এবার যে ঘটনা ঘটেছে তাতে শামীম ওসমানের এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের দেউলিয়াত্ব নিয়ে কথা উঠতে শুরু করেছে।

শামীম ওসমানের অনুগামীরা বক্তব্য দিতে শুরু করলে কিছু বাক্য বার বার উচ্চারণ করেন। ‘নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের কা-ারী, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের অভিভাবক, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের নেতা’। তবে কুতুবপুর ইস্যুতে এসব বক্তব্য নিছক মাইকের স্ট্যান্টবাজি আর সস্তা জনপ্রিয়তা হিসেবেই ভাবছে মানুষ।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন, শামীম ওসমান এত কড়া কথা বলেন, তার বক্তব্য শুনে যখন দেশপ্রেমের জন্য রক্তগরম হয়ে উঠে, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও দেশ রক্ষায় শপথ নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হই তখন এ এমপির এলাকাতেই এবার নৌকার একজনকে মাঝি করা হয়েছে যার রক্তে মিশে রয়েছে নাশকতা, জঙ্গিবাদী কর্মকা-। কয়েক বছর আগেও সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক জঙ্গি স্টাইলে কর্মকান্ড করতো। আনুষ্ঠানিক যোগ দেয়নি আওয়ামী লীগে। এখনো সেখানকার বিএনপি নেতারা নিজেদের পোস্টারে জুড়ে দেন সেই নেতা মনিরুল আলম সেন্টুর ছবি। ২০১৪ সালে যখন জালাও পোড়াও ঘটে তখন এ নেতার নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে আগুন, নাশকতা করা হয়। পুলিশের উপর হামলা করা হয়। দুই বছর আগেও স্লোগান দিত ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’ এখন সেই নেতাকে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নৌকার বৈঠা। কারণ সেখানে আওয়ামী লীগের কাউকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি কোন নেতাকে। বরং তলে তলে সেন্টু আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোশকতায় বেড়ে উঠেছেন।

বড় অবাক করার বিষয় কুতুবপুরে আওয়ামী লীগের বিকল্প আর কারো নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি। ইউনিয়নের প্রার্থী তালিকায় ১ নাম্বারে নাম দেয়া হয়েছে মনিরুল আলম সেন্টুর। আওয়ামীলীগের দীর্ঘদিন ধরে দল করা নেতাকর্মীদের নাম পেছনে দিয়ে তার নাম আগে দেয়ায় নেতাকর্মীরা ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্দ হলেও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলেননি। তবে অনেকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সেন্টুর পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছেন।

জানা যায়, ফতুল্লা আওয়ামীলীগের নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি সাইফউল্লাহ বাদলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মূলদলের নেতাকর্মীরা। টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেও আওয়ামীলীগ সেন্টুর কোন বিকল্প বের করতে পারেনি এ ইউনয়নে। শুধু চেয়ারম্যান পদে নয়, দলের হাল ধরার জন্যও এ অঞ্চলে নেই কোন শক্ত নেতা।

তবে শুধু এবারই না। এর আগের তথা ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও এ সেন্টুকে জয়ী করাতে নৌকাকে ডুবিয়ে দেওয়া হয় পরিকল্পনা মাফিক। গত নির্বাচনে মনিরুল আলম সেন্টু ৪২ হাজার ৯০৩ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের আওয়ামীলীগ প্রার্থী গোলাম রসুল শিকদার পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৮৭ ভোট। ব্যবধান প্রায় ৩২ হাজারেরও বেশী। ভোটের দিন কুতুবপুরের অনেক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেলপাড়ার একটি কেন্দ্রে বুকে নৌকার প্রতীকের কাগজ সাটিয়ে সেন্টুর আনারসের প্রতীকের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে।

সেন্টু এক সময়ের বিএনপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ফতুল্লা এলাকাতে বিএনপির ভাষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আওয়ামী লীগের ভাষা যেটা ‘নাশকতা’ তার নেতৃত্বে ছিলেন সেন্টু। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে ফতুল্লায় ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা সহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ডজনখানেক মামলাও আছে।

জানা যায়, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পক্ষে নৌকায় ভোট চেয়ে প্রচারণার অভিযোগ এনে তৎকালীন ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ সভাপতি মনিরুল আলম সেন্টুকে বহিস্কার করে বিএনপি। দলের সহ দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদ এ তথ্য তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে পথ আরো পরিষ্কার হয় সেন্টুর। আর তাই এবার নৌকার পক্ষের লোকজন তাকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে প্রচার করছেন।

সেন্টু বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ধীরে ধীরে আওয়ামীলীগে ঘেঁষতে থাকেন। এমপি শামীম ওসমানকে ‘পীর’ হিসেবেই আখ্যায়িত করে বক্তব্য রাখেন। শামীম ওসমান সংসদ সদস্য হবার পর থেকে সেন্টু তার অনুগত হয়ে যান। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও শামীম ওসমানের সকল নির্দেশনা পালন করতেন এই সেন্টু। সেন্টুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলো। এ ছাড়াও আওয়ামীলীগের একটি বড় অংশ রয়েছে সেন্টুর সাথে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও