জন্মজেলায় কলঙ্কিত আওয়ামী লীগ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৫ পিএম, ৮ অক্টোবর ২০২১ শুক্রবার

জন্মজেলায় কলঙ্কিত আওয়ামী লীগ

নানা কারণেই আলোচিত সমালোচিত নারায়ণগঞ্জ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ অভূত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ ছিল সব সময়ে অগ্রগামী। বঙ্গবন্ধু অনেকবার এসেছেন নারায়ণগঞ্জ। এ জেলার চাষাঢ়া বাইতুল আমানে বসে অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখানে বসেই আওয়ামী লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ১৪৪ ধারা জারির কারণে বঙ্গবন্ধু এখানে বসতে পারেনি। ঢাকায় যাওয়ার আগে পাইকপাড়ায় মিউচুয়েল ক্লাবে বৈঠক করেন। পরে রাজধানীর রোজ গার্ডেনে দিয়ে ঘোষণা দেন। কিন্তু গোড়াপত্তন এ জেলাতেই। অনেক রাজনৈতিক উত্থান পতনে আওয়ামী লীগের জন্মজেলা আর পলিটিক্যাল হান্টিং গ্রাউন্ড খ্যাত নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ এবার কলঙ্কিত হতে চলেছে। কারণ আসছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিতে লোভ সামলাতে পারছেন না আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তাদের কারসাজিতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে বিরাজ করছে হতাশা। ত্যাগী নেতাকর্মীরা বোবা কান্নায় লিপ্ত। কারণ বিএনপির ঘরনার নেতাদের ডেকে এনে নৌকা প্রতীক দিতে সুপারিশ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশী আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে কুতুবপুর ইউনিয়ন। আগামী ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বিএনপির এক নেতাকে। যা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। ইতোমধ্যে কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ থেকে একমাত্র তার নামটি মনোনয়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। যার ফলে এখানে অন্য কারও আসার সুযোগও নেই।

যদিও ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী বলেছেন, যেহেতু এখানে একটি মাত্র নাম এসেছে এবং যার নামটি এসেছে তাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে তাই এ বিষয়টি আমরা কেন্দ্রের উপড় ছেড়ে দিয়েছি। তারা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে।

কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন বলেন, কুতুবপুর বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে গত তিনবারই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছে। নৌকার প্রার্থী মাত্র ৫-১০ হাজার ভোট পায় এইখানে। এবার তৃণমূল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুকেই নৌকার মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। দলীয় সিদ্ধান্তে একমাত্র তার নামই মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে বিএনপি ঘেঁষা হাইব্রিড ও বহুল আলোচিত সমালোচিত বিতর্কিত নেতা ফজর আলী আসন্ন গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। বিগত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নৌকা ডুবানোর নাটের গুরু হিসেবে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন এই ফজর আলী। এতো কিছুর পরেও আম পাতা মার্কা নেতা ফজর আলীকে মোটা অংকের বিনিমেয় চেয়ারম্যান করতে কাজ করছে প্রভাবশালী মহল। এতে করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি সদর থানা আওয়ামীলীগের আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুনের এক চাঞ্চল্যকর বক্তব্যের পর এমপি শামীম ওসমানের সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া প্রকাশ্যে ফজর আলীর পক্ষে ভোট চেয়ে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল। এমনকি ফজর আলীর নৌকার মনোনয়ন না পেলে প্রয়োজনে আম পাতা মার্কা দিয়ে তাকে জয়যুক্ত করার আহবান জানান সদর থানা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আল মামুন। আর সেই বক্তব্যের সময় পাশে বসা ছিলেন বাদল। এখন পর্যন্ত সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি এই নেতা। এতে করে যোগসাজসের একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

২৪ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, ‘ফজর আলীকে (গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী) আমরা আপনারা সকলে মিলে নৌকা পাইলেও পাশ করামো না পাইলেও পাশ করামো। যদি সম্ভব হয় ফজর আলী ভাইকে আমপাতা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করামো। ফজর আলী ভাইকে পাশ করিয়ে নিবোই। নৌকার দরকার নেই। নৌকা একটা মার্কা। ভোট দিবেন আপনারা। ভোট দিব আমরা। ফজর আলী ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি রাখবেন।’

এদিকে সদর থানার আলীরটেক ইউনিয়নে মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগ যে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছেন তাদের একজন সায়েম আহমেদ। অথচ এক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।

জানাগেছে, সায়েম আহমেদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানা ও মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় চাঁদাবাজি, মারামারি, হত্যাচেষ্টা, হত্যার উদ্দেশ্যে গুম ইত্যাদি অভিযোগে বেশি কিছু মামলা আছে এবং একটি মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ৩ মে গণভবন থেকে উদ্বোধন করেন কুড়েরপাড়ে ৫২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের সিনহা পিপলস এনার্জি লিমিটেডের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের। ১০ মে সিনহা পিপলস এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শাহাবুদ্দিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডিতে বলেন, বিদ্যুকেন্দ্রের নিজস্ব জেটির সামনে সায়েম, কাশেম, শাহ আলম, মো. আলী ৭ মে খালি বার্জ ও লাইটারেজ জাহাজ নোঙর করে রাখেন যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জাহাজ জেটিতে ভিড়তে না পারে। সন্ত্রাসীরা বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও কেন্দ্রে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

সিনহা পিপলস এনার্জির নির্বাহী পরিচালক মামুন হায়দার তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সায়েম প্রথমে নিজের জমি দাবি করে সেসব কম্পানির কাছে বেচতে চান। পরে কম্পানি খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষের জমি কম দামে বায়না করে কয়েকগুণ টাকা নিয়ে কম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করছেন। এরপর মানুষজন সরাসরি কোম্পানির কাছে জমি বিক্রি করে।

দৈনিক কালের কণ্ঠের এক সংবাদ মতে আলীরটেক ইউনিয়নের কুড়েরপাড় এলাকার সায়েম আহমেদকে এক যুগ আগেও লোকজন চিনত নুরু মিয়া নামে। বিদ্যালয়েও এই নাম ছিল তাঁর। তবে শহরের বাবুরাইল এলাকার প্রভাবশালী পরিবারে বিয়ের পর নাম পাল্টে বনে যান সায়েম আহমেদ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তারা আওয়ামী লীগের অসম্মান করছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কেন্দ্রীয় নেতারা দেখুক নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করছে কারা। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগে ধ্বংসের মূল তারা। বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি জামাত জাতীয় পার্টিকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছে তারা।

তিনি আরও বলেন, সেন্টু একজন নামধারী বিএনপির লোক। সে আদৌ আওয়ামী লীগে যোগ দেয় নাই। অদ্যাবধি জানি সে বিএনপি করে। সেখানে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী আছে। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে বিএনপির লোকের কাছ থেকে টাকা খেয়ে মনোনয়ন দিচ্ছে। বিএনপির লোককে নৌকা প্রতিক দিচ্ছে। ছি! ছি! ছি! ঘৃণা লাগে, কষ্ট লাগে যে নৌকার জন্য আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। নেতাকর্মীদের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আজ বিএনপির লোকদের এনে নৌকা প্রতিক দেয়া হয়। কষ্ট আমাদের। আমাদের নেত্রী যেখানে বলছেন কোনো ব্যাঙ কাউয়া হাইব্রীড নিবে না। সেখানে কিভাবে মনোনয়ন দেয়। আমাদের নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আজকে নারায়ণগঞ্জে কি হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীরা জীবন দেয়ার প্রস্তুত রয়েছে সেখানে বিএনপির লোককে নৌকা প্রতিক দিতে হবে? আল্লাহ না করুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকে তাহলে এই সেন্টু চলে যাবে। তখন আমরাই থাকবো আমরাই ছিলাম থাকবো মৃত্যু পর্যন্ত। ফতুল্লা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপড় বিচারের ভার দিলাম।

জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আব্দুল কাদির বলেছেন, তারা দুইজনই (সেলিম ওসামন ও শামীম ওসমান) দল বুঝে না। তারা ব্যক্তির স্বার্থে রাজনীতি করে। কার কতটুকু ক্ষমতা আছে সে দিকটাই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। বিএনপি হোক কিংবা জাতীয় পার্টি হোক অথবা জামাত হোক সেগুলো তারা বিবেচনা করেন না। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কাকে কি করা যায় কার উপর কতটুকু প্রভাব কাটানো যাবে কিংবা সুবিধা পাওয়া যাবে এসকল দিক চিন্তা করেই তারা একেক সময়ে একেক জনকে ব্যবহার করে।

তিনি আরও বলেন, তাদের এসকল বিষয়গুলো বরাবরই পত্রিকাতে উঠে আসে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি তারা ভুলে গেছেন। তাদের ইচ্ছামতো যে কাউকেই মনোনয়ন দিচ্ছেন। আমরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের কাছে অসহায়। তাদের এসকল কর্মকান্ডে কেন্দ্রের নজর দেয়া উচিত। তাদের কার্যক্রম ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ক্ষতির মুখে পড়বে। তাদের কারণে অনেকেই দল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নেতাকর্মীরা আমাদের কাছে আফসোস করে।

এর আগেও নারায়ণগঞ্জে এসব নিয়ে বিতর্কেল সৃষ্টি হয়েছির। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের প্রস্তাবিত সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের কথিত সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ঠিকাদার জিকে শামীমকে ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা, ১৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকার এফডিআর, সর্টগান, মাদক, বিদেশি অর্থসহ গ্রেফতারের পরে আবারো আলোচনায় এসেছিল হাইব্রীড ইস্যুটি। কারণ ১০ বছর পূর্বে বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল থেকে যুবলীগে যোগ দিলেও এখন জিকে শামীমকে যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতারা অস্বীকার করছেন। ফলে বিগত দিনে যেসকল বিএনপি নেতা ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছেন তারা আবারো এসেছেন আলোচনায়। অথচ এ জিকে শামীমকে দেখতে গিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও