উড়ে কাউয়া লাফায় ব্যাঙ

শাহরিয়ার অর্ক ,স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৫২ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২১ শনিবার

উড়ে কাউয়া লাফায় ব্যাঙ

নারায়ণগঞ্জে ক’ বছর আগে জিকে শামীম ওসমানের একজন ঠিকাদার গ্রেপ্তারের পরেই হাইব্রিড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কারণ ওই সময়ে শুধু নারায়ণগঞ্জ না বরং বিভিন্ন স্থানেই এসব হাইব্রিড নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। নারায়ণগঞ্জেও তখন মহানগর আওয়ামীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলতেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে বিভিন্ন স্থানে বসার চেয়ার দেওয়া হয় না। তাঁরা অবমূল্যায়িত হয়। আর দলে ঢুকে যাওয়া কাউয়া ব্যাঙরা ডাকাডাকি করলে নেতাদের পেছনেই ছুটে চলেন।’ আনোয়ার হোসেনের ওই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে। কারণ এবার নারায়ণগঞ্জে আসছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে হাইব্রিডদের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ করেনি এমন নেতাদের মনোনয়ন দিতে উঠেপড়ে লেগেছে সরকার দলীয় প্রভাবশীরা।

নারায়ণগঞ্জের তিনটি ইউনিয়নে এ বিষয়ে ঘোর আপত্তি করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই। তিনি নিজেও এসব হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। জানা যায়, আলীরটেক ইউপি নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেন ও সায়েম আহমেদ। কিন্তু এদের কেউই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নেই। গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিন। কিন্তু তার নামটি না পাঠিয়ে নব্য আওয়ামী লীগার ব্যবসায়ী ফজর আলীর নাম পাঠানো হয়েছে। কুতুবপুরে আওয়ামী লীগের সকল মনোনয়ন প্রত্যাশীকে পিছনে ফেলে বিএনপি নেতা মনিরুল আলম সেন্টুকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে কেন্দ্রে নাম পাঠানো হয়েছে। এ তিনটি ইউনিয়নের সুপারিশে আবদুল হাই স্বাক্ষর করেননি।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ ক্রমশ যেন রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাতে বসেছে। এ জেলাতে আওয়ামী লীগের জন্ম। রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ অভূত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ ছিল সব সময়ে অগ্রগামী। বঙ্গবন্ধু অনেকবার এসেছেন নারায়ণগঞ্জ। এ জেলার চাষাঢ়া বাইতুল আমানে বসে অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখানে বসেই আওয়ামী লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। অনেক রাজনৈতিক উত্থান পতনে আওয়ামী লীগের জন্মজেলা আর পলিটিক্যাল হান্টিং গ্রাউন্ড খ্যাত নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ এবার কলঙ্কিত হতে চলেছে।

সেন্টু এক সময়ের বিএনপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ফতুল্লা এলাকাতে বিএনপির ভাষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আওয়ামী লীগের ভাষা যেটা ‘নাশকতা’ তার নেতৃত্বে ছিলেন সেন্টু। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে ফতুল্লায় ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা সহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ডজনখানেক মামলাও আছে।

আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সানাউল্লাহ সানু বলেন, একজন ত্যাগী কর্মী আমাকে বললো কেমন আছেন, আমি বললাম ভালই আছি। সে বললো ভালোই কামাচ্ছেন, নির্বাচন সামনে বিএনপি দের কাছে নৌকা বেঁচে দিচ্ছেন, ভালই থাকবেন। লোকটা রেগে আরো কি যেন বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে চলে গেল। মনে হলো আমাদের অনেক ঘৃণা করে সে। কিছুই বুঝতে পারলাম না শুধু বোকার মতো চেয়ে রইলাম’।

সানাউল্লাহ বলেন, আমাদের কি আওয়ামী লীগের লোক নেই? কুতুবপুরে গতবার গোলাম রসূলকে পরাজিত করে দেয়া হইসে। আরও মানুষ আছে। তাদের বাদ দিয়ে সেন্টুকে দেয়ার কারন সবাই বুঝে। গোলাম রসূল মনোনয়নের আবেদন করছে কেন্দ্রে। গতবারও পেয়েছিলো, কিন্তু লাভ হয়নি। এবার তো সেন্টুও আবেদন করেছে কেন্দ্রে। কুতুবপুর ছিল আওয়ামী লীগের ঘাটি। এখন আর নেই। যেই আদর্শ নিয়ে দল করেছি সেগুলো ভাবলে খারাপ লাগে।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের নেত্রী যেখানে বলছেন কোনো ব্যাঙ কাউয়া হাইব্রীড নিবে না। সেখানে কিভাবে মনোনয়ন দেয়। আমাদের নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আজকে নারায়ণগঞ্জে কি হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীরা জীবন দেয়ার প্রস্তুত রয়েছে সেখানে বিএনপির লোককে নৌকা প্রতিক দিতে হবে?

এদিকে কুতুবপুর ফতুল্লা থানার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এখানে ভোটর সংখ্যাও বেশী। সেখানে নৌকার দৈন্যদশার কথা নিজেই স্বীকার করেছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন। তিনি বলেছেন, এখানে গত তিনবারই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছে। নৌকার প্রার্থী মাত্র ৫-১০ হাজার ভোট পায় এইখানে। এবার তৃণমূল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুকেই নৌকার মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। দলীয় সিদ্ধান্তে একমাত্র তার নামই মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

তবে শুধু এবারই না। এর আগের তথা ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও এ সেন্টুকে জয়ী করাতে নৌকাকে ডুবিয়ে দেওয়া হয় পরিকল্পনা মাফিক। গত নির্বাচনে মনিরুল আলম সেন্টু ৪২ হাজার ৯০৩ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের আওয়ামীলীগ প্রার্থী গোলাম রসুল শিকদার পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৮৭ ভোট। ব্যবধান প্রায় ৩২ হাজারেরও বেশী। ভোটের দিন কুতুবপুরের অনেক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেলপাড়ার একটি কেন্দ্রে বুকে নৌকার প্রতীকের কাগজ সাটিয়ে সেন্টুর আনারসের প্রতীকের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে।

২৪ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, ‘ফজর আলীকে (গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী) আমরা আপনারা সকলে মিলে নৌকা পাইলেও পাশ করামো না পাইলেও পাশ করামো। যদি সম্ভব হয় ফজর আলী ভাইকে আমপাতা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করামো। ফজর আলী ভাইকে পাশ করিয়ে নিবোই। নৌকার দরকার নেই। নৌকা একটা মার্কা। ভোট দিবেন আপনারা। ভোট দিব আমরা। ফজর আলী ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি রাখবেন।’

জসিমউদ্দিন বলেন, ফজর আলীর পরিবার ছিল বিএনপি সমর্থিত ও ঘেষা। ওরা কখনো আওয়ামীলীগ করে নাই। আওয়ামীলীগের সাথে কখনো সম্পৃক্ত ছিলনা। বিশেষ করে তার ভাই (নওশেদ চেয়ারম্যান) বিগত নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কাজ করে নৌকা ডুবিয়েছে। আজকে ফজর আলী নৌকা চাচ্ছে, অথচ বিগত নির্বাচনে নৌকাকে ডুবানোর জন্য সে ও তার লোকজন যতরকম প্রক্রিয়া আছে সব করেছে। ২০১৬ সালের ওই নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করে নৌকা ডুবিয়েছে।

এদিকে সদর থানার আলীরটেক ইউনিয়নে মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগ যে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছেন তাদের একজন সায়েম আহমেদ। অথচ এক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।

জানাগেছে, সায়েম আহমেদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানা ও মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় চাঁদাবাজি, মারামারি, হত্যাচেষ্টা, হত্যার উদ্দেশ্যে গুম ইত্যাদি অভিযোগে বেশি কিছু মামলা আছে এবং একটি মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ৩ মে গণভবন থেকে উদ্বোধন করেন কুড়েরপাড়ে ৫২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের সিনহা পিপলস এনার্জি লিমিটেডের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের। ১০ মে সিনহা পিপলস এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শাহাবুদ্দিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডিতে বলেন, বিদ্যুকেন্দ্রের নিজস্ব জেটির সামনে সায়েম, কাশেম, শাহ আলম, মো. আলী ৭ মে খালি বার্জ ও লাইটারেজ জাহাজ নোঙর করে রাখেন যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জাহাজ জেটিতে ভিড়তে না পারে। সন্ত্রাসীরা বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও কেন্দ্রে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও