নৌকা ডুবাতে চায় আওয়ামী লীগ নেতারা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:১৭ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২১ শনিবার

নৌকা ডুবাতে চায় আওয়ামী লীগ নেতারা

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ও আলীরটেক এই দুটি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকার মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামীলীগের পদধারী নেতারা অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা থেকে শুরু মিটিং মিছিলে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে জ্বালাময়ী বক্তব্যও দিচ্ছেন এই নেতারা। গোগনগর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী ফজর আলীর পক্ষে সদর থানা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আল মামুন সহ স্থানীয় আওয়ামীলীগের একটি অংশ মাঠে নেমেছে। একইভাবে আলীরটেক ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী সায়েমের পক্ষেও একই অংশ নেমেছে। এতে করে নৌকা ডুবানোর জন্য কার্যত অর্থে আওয়ামীলীগের নেতারা দায়ী। অথচ কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে সমর্থনের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হলেও তাতে কেউ কর্ণপাত করছেনা। তবে আওয়ামীলীগের এরুপ নেতাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য নৌকার ভরাডুবি হলে এর দায় কে নেবে এমন প্রশ্ন এখন তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

আগামী ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্যে গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতিকে মনোনয়ন দেয়া হয় জসিমউদ্দিনকে। যদিও তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও হাইব্রিড নেতা ফজর আলী এককভাবে মনোনয়ন বাগিয়ে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষতক স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। অন্যদিকে আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তিনজন নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও শেষতক মতিউর রহমান নৌকার মনোনয়ন পেয়ে যান। তবে অসুস্থ্যতার কারণে মতিউর রহমান নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে জাকির হোসেনের নৌকার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নৌকার প্রার্থী হিসেবে মতিউর রহমানের নাম রয়েছে। তবে এই ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী সায়েম আহমেদের পক্ষে আওয়ামীলীগের একটি অংশ মাঠে নেমেছে।

১৪ অক্টোবর গোগনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিতর্কিত নেতা ফজর আলী মনোনয়নপত্র জমা দেন। ওই সময় তার পাশে ছিল সদর থানা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আল মামুন, জেলা শ্রমিকলীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য মজিবর রহমান, গোগনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কথিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোসলেউদ্দিন আহমেদ সহ প্রমুখ। এরা সবাই আওয়ামীলীগের নেতা হয়েও বিদ্রোহী প্রার্থী পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন করছে এবং তার বিভিন্ন মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে বিষোদগার করছে।

এর আগে নৌকার প্রার্থী ঘোষণার পর ১০ অক্টোবর বিকেলে গোগনগর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী ফজর আলী বিশাল মিছিল করে। এসময় আওয়ামীলীগের অনেক পদধারী নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে নৌকা প্রতিকে ভোট দিতে নিষেধ করেন। এবং নৌকার প্রার্থী জসিমউদ্দিনের তীব্র সমালোচনা করেন।

ওই মিছিল শেষে সদর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাজির হোসেন জসিমউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গিয়ে তিন দিন পরে এসে বলে নৌকা পাইছি। হে নৌকা পাইছেন। নৌকা নিয়ে থাইকেন। আমরাও আওয়ামীলীগ করি। আপনি নৌকা নিয়া আসছেন আপনাকে নৌকা নিয়ে মোকাবেলা করবো। নৌকা আপনার থাকবে, ফজর আলী যে মার্কা পাবে আমরা সেটা নিয়ে আপনার সাথে খেলবো।

জেলা শ্রমিকলীগের সদস্য মজিবর রহমান বলেন, টাকা পয়সা কামিয়ে গাট্টি ভরে শহরে নিয়ে যাবে এই নৌকাকে আমরা ভোট দিবনা। ফজর আলী ভাইয়ের পক্ষে আছি, ফজর আলী ভাইকে আগামীতে পাশ করাবো ইনশাআল্লাহ।

গোগনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কথিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোসলেউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নৌকা মার্কা পাই নাই তো কি হয়েছে। আপনারা জানেন গত নির্বাচনে নওশের আলী নৌকা মার্কা পায় নাই। তাকে আমরা হোন্ডা মার্কা দিয়ে পাশ করিয়েছি। এই বছরও আমরা আশা করি ফজর আলী যে মার্কা পাক না কেন তাকে জয়ের মালা পড়িয়ে গোগনগর বাসিকে উপহার দিতে চাই। আপনাদের সবার কাছে আমার আহবান আপনারা ফজর আলীর সালাম পৌছে দিবেন। ধন্যবাদ, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু জয় হোক ফজর আলীর।

আওয়ামীলীগ নেতা হাজী কামাল বলেন, আমরা নৌকা প্রতিককে সম্মান করি। তবে সেটি জাতীয় পর্যায়ে নৌকা দিতে হবে। তাহলে নৌকা প্রতিককে সম্মান করবো আজীবন সম্মান করবো। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের ভোটে আমরা তাকে দেখাইয়া দিবো। ১১ তারিখ সকাল ১২টায় আমরা ঘোষণা দিয়ে দিবো যে আমরা পাশ করেছি।

এর আগে গত ২৪ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, ‘ফজর আলীকে (গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী) আমরা আপনারা সকলে মিলে নৌকা পাইলেও পাশ করামো না পাইলেও পাশ করামো। যদি সম্ভব হয় ফজর আলী ভাইকে আমপাতা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করামো। ফজর আলী ভাইকে পাশ করিয়ে নিবোই। নৌকার দরকার নেই। নৌকা একটা মার্কা। ভোট দিবেন আপনারা। ভোট দিব আমরা। ফজর আলী ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি রাখবেন।’ এছাড়াও নৌকার মনোনয়ন দেয়ার আগে জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল প্রকাশ্যে ফজর আলীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন ও তাকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, বিতর্কিত ও বিএনপি ঘেষা ফজর আলীকে মাইনাস করে জসিমউদ্দিনের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমান। তবে এর মাত্র কিছুদিন পরে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল প্রকাশ্যে ফজর আলীকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। এমনকি নৌকার মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে এককভাবে ফজর আলীর নাম পাঠানো হয়। আর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এক সাংসদ তদবির করে নৌকা প্রতিকের মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে যার মধ্যস্থতা করে এই বাদল। তবে শেষতক আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতা জসিমউদ্দিনের হাতে নৌকার মনোনয়ন তুলে দেয়া হয়। এখন আবার নৌকা ডুবিয়ে সেই বিদ্রোহী প্রার্থী ফজর আলীকে জয়ী করতে মাঠে নেমেছে আওয়ামীলীগের একটি অংশ। এসব আওয়ামীলীগ নেতাদের পেছন থেকে রথি মহারথিরা কলকাঠি নাড়ছে।

এদিকে আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী সায়েম আহমেদ এক সময়ে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। এই বিষয়টি এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। এরপরও কিছু আওয়ামীলীগ নেতা বিতর্কিত নেতা সায়েমের পক্ষে কাজ করছে। বিদ্রোহী প্রার্থী সায়েম গত ১৩ অক্টোবর মনোনয়ন পত্র দাখিল করেন। সেসময় তার পাশে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শওদাগর খানকে দেখা গেছে।

বিদ্রোহী প্রার্থী সায়েমের মনোনয়ন দাখিলের সময়ে আওয়ামীলীগ নেতা শওদাগর খানের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি মূলত সায়েমের জন্য সেখানে যাননি। অন্য মেম্বার প্রার্থীরা মনোনয়ন পত্র দাখিল করছিল একই সময়ে। তাদের জন্য গিয়েছিলেন। এবং আমি যেহেতু দল করি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারিনা।

তবে এই ঘটনার মাত্র একদিনের ব্যবধানে ফের সায়েমের সাথে দেখা গেছে এই আওয়ামীলীগ নেতা শওদাগার খানকে। সায়েম একের পর এক সভা, মিটিং মিছিল করে যাচ্ছে। আর সেখানে সায়েমের পাশে বিগত দিনের মত এই নেতা নেতাকে দেখা গেছে। এতে করে বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতি তার সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, সায়েম আহমেদ এক সময়ে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। পদ পদবী হাসিলের খায়েসে বিএনপির বিভিন্ন সভা সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছে। তবে সময়ের ব্যবধানে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকার ফলে ভোল পাল্টে আওয়ামীলীগের যোগদান করেছে। সম্প্রতি তার বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও