হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দের নদ দূষণের কবলে

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০১ পিএম, ২৪ মার্চ ২০১৭ শুক্রবার

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দের নদ দূষণের কবলে

পাপ মোচনের আশায় প্রতিবছর দেশ-বিদেশের লাখো পূণ্যার্থী হাজির হন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে অবস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান ব্রক্ষ্মপুত্র নদে। তবে গেল কয়েকবছর ধরে সেই নদ পড়েছে দূষণের কবলে। অভিযোগ উঠেছে টোটাল ফ্যাশন, জাহিন নিটওয়্যারসহ কয়েকটি কারখানার বিরুদ্ধে। ওই সকল কারখানার নিঃসৃত তরল বর্জ্য পরিশোধন না করেই ফেলা হচ্ছে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে। পরিবেশ অধিদপ্তরের চোখকে ফাঁকি দিয়ে রাতের আধারে ফেলা হচ্ছে তরল বর্জ্য। এছাড়া টোটাল ফ্যাশনের বিরুদ্ধে ওই এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে জমি দখলের অভিযোগে মামলাসহ শ্রমিকদের নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

জানা গেছে, আগামী ৩ ও ৪ এপ্রিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে স্নানোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। স্নানোৎসব কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একজন সচিব, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্বতনরা স্নানঘাটগুলো পরিদর্শন করেছেন। এদিকে পাপ মোচনের আশায় নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে ১৩টি স্নানঘাটে দেশ বিদেশের লাখো পূণ্যার্থীর সমাগম ঘটলেও গত কয়েক বছর ধরেই ব্রক্ষ্মপুত্র নদটি পড়েছে দূষণের কবলে। অভিযোগ রয়েছে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে টোটাল ফ্যাশন, জাহিন নিটওয়্যার ও বাশার পেপার মিলসহ কয়েকটি কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এই পানিতে গোসল করে ইতিমধ্যেই চুলকানি, খোশ-পাঁচরাসহ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে এখানকার বাসিন্দারা। নাব্যতা হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ব্রক্ষ্মপুত্র নদ। এর আগে একাধিকবার অভিযোগ করার পরেও কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি জেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদফতর। মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব শুরু হতে আর মাত্র ১০ দিন বাকী। এখনই এই দূষন প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে দেশ বিদেশ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ পূন্যার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে বলে অভিমত ব্যাক্ত করেন স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দরা।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর বিকেএমইএ’র সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একটি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দু’টি কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ওই সভায় সেলিম ওসমান বলেন, জামালউদ্দিন আমাদের বিকেএমইএ’র পরিচালক। মদনপুরে কেওঢালায় অবস্থিত তারা মালিকানাধীন জাহিন নিটওয়ার থেকে দূষিত বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি লাঙ্গলবন্দের ব্রক্ষ্মপুত্র নদে নিক্ষেপ করা হচ্ছে বলে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। এছাড়া কামতাল এলাকায় স্থাপিত টোটাল ফ্যাশন থেকেও দূষিত বর্জ্য সরাসরি ব্রক্ষ্মপুত্র নদে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তাদের ইটিপি থাকলেও তারা ইটিপি ব্যবহার করছেনা। সভায় উপস্থিত মদনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালামও এমপির বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

এরপর ২০১৬ সালের ৮ জুলাই বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের বারপাড়া গ্রামে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে স্থানীয় এমপি ও বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে নদের পাড় দেখেন এবং পানিতে র্দুগন্ধের সত্যতা পান। পরে তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতি অনুরোধ রেখে বলেন,  ইটিপি ছাড়া সরাসরি ডাইংয়ের পানি নদীতে অপসারন করা আইনত অপরাধ। যদি কোন কারখানা মালিক ইটিপি ছাড়া ডাইংয়ের পানি ব্রহ্মপুত্র নদে কিংবা যেকোন নদী ও খালে অপসারন করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা এ হবে। বিষয়টি সরকারী সংশ্লিষ্ট দফতরকে খতিয়ে দেখার আহবান জানাচ্ছি।

এদিকে এমপি সেলিম ওসমানের ওই আহবানের পরেও জেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদফতর কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। রাতের আধারে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে নিঃসৃত হচ্ছে দূষিত তরল বর্জ্য। অভিযুক্ত তিনটি কারখানাতেই ইটিপি (এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকলেও তারা সেগুলো দিনের বেলায় আইওয়াশ হিসেবে চালিয়ে রাখে। আর রাতের বেলায় অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি ব্রক্ষ্মপুত্র নদে ফেলা হয়। অপরদিকে টোটাল ফ্যাশনের বিরুদ্ধে শুধু নদের পানি দূষণই নয় স্থানীয় কৃষকদের জমিও দখলের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারী রাতে টোটাল ফ্যাশনের মালিকপক্ষের ক্যাডাররা একজন কেয়ারটেকার ও একজন রাজ মিস্ত্রিকে অপহরণ করে আটকে রেখে ১০ বিঘা জমিতে টিনের বেড়া দিয়ে দখল করে নেয়। পরে কেয়ারটেকার ও রাজমিস্ত্রিকে চোর আখ্যা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়। পরে ওই ঘটনায় টোটাল ফ্যাশনের ম্যানেজারসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করা হয়।  

এ বিষয়ে মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক সরোজ কুমার সাহা জানান, টোটাল ফ্যাশন ও জাহিন নিটওয়্যাারসহ আশেপাশের কারখানাগুলোর ব্রক্ষ্মপুত্র নদে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নির্গত করা এখনো বন্ধ হয়নি। আমরা এর আগেও একাধিকবার বিষয়টি স্থানীয় এমপি ও জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। তবে এরপরেও তরল বর্জ্য নিক্ষেপ বন্ধ হয়নি। আমরা স্থানীয়দের কাছে শুনেছি ওই কারখানাগুলোতে ইটিপি থাকলেও তারা ইটিপি না চালিয়ে রাতের আধারে তরল বর্জ্য ব্রক্ষ্মপুত্র নদে নিক্ষেপ করে। আগামী ২৭ মার্চ স্নানোৎসব উপলক্ষ্যে আমাদের সভা রয়েছে। সেদিনও বিষয়টি উত্থাপন করবো।

বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন জানান, টোটাল ফ্যাশন, জাহিন নিটওয়্যার ও বাশার পেপার মিল অনবরত অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ব্রক্ষ্মপুত্র নদে ফেলছে। এতে করে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের অবস্থা ক্রমশই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আমরা এর আগেও একাধিকবার অভিযোগ করার পরে টোটাল ফ্যাশনসহ কয়েকটি কারখানাকে জরিমানা করা হলেও তরল বর্জ্য নিক্ষেপ বন্ধ হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ পরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম জানান, আমরা যতবারই ওই কারখানা তিনটিতে গিয়েছে ততবারই তাদের ইটিপি চালু পেয়েছি। তাদের কোন বাইপাস সংযোগ পাইনি। যদি কেউ তাদের বাইপাস সংযোগ সম্পর্কে জেনে থাকেন তাহলে যেন আমাদের জানান। তবে কারখানাগুলো রাতের আধাঁরে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নিক্ষেপ করে কিনা সেটা আমাদের জানা নেই। এ ধরনের প্রমান পেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বন্দর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী হাবিব জানান, এ বিষয়ে স্নানোৎসব উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ আমাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমি গতকালই এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা শনিবারই বিষয়টি নিয়ে অভিযানে বের হবে। মহান স্বাধীনতা দিবসের পরে আমরা যৌথভাবে এ বিষয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করবো।  


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও