চাষাঢ়ায় মাদ্রাসা দখলের চেষ্টা!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৩০ পিএম, ১ মার্চ ২০২১ সোমবার

চাষাঢ়ায় মাদ্রাসা দখলের চেষ্টা!

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় জমি দখলে বাধা দেওয়ার জের ধরে পিতা ও পুত্রকে মারধর করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি ভূমিদস্যুরা। জমিটি দখলে নিতে এবার মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার ৩ পুত্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যার চেষ্টা ও চুরির মামলা দায়ের করেছে ভূমিদস্যুরা।

ওই মিথ্যা মামলায় সোমবার ১ মার্চ দুপুরে মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার এক পুত্রকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। আসামীপক্ষের অভিযোগ পুলিশ ভূমিদস্যুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রেকর্ড করেছে।

মামলার ১নং আসামী মাওলানা আব্দুর রহিম শহরের চাষাঢ়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে নিজস্ব জমিতে প্রতিষ্ঠিত বাইতুন নাজাত মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ পদে রয়েছেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। তার ৩ জন পুত্রও বিভিন্ন মাদরাসায় অধ্যয়ন করছে। যার মধ্যে ২নং আসামী বড় ছেলে সাইফউল্লাহ সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ের দারুল উলুম মাদানীনগর থেকে দাওড়া উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে একটি চাকরি করছে। ৩নং আসামী মেঝ ছেলে মারুফ যাত্রাবাড়িস্থ একটি মাদরাসায় দাওড়া বিভাগে অধ্যয়ন করছে। ৪নং আসামী হুজাইফা সাইনবোর্ডের জামিয়া আশরাফিয়া মাদরাসায় জালালাইন বিভাগে অধ্যয়ন করছে।

মামলার বাদি ইউসুফ আমিন শহরের নিউ চাষাঢ়া জামতলা এলাকার বাসিন্দা।

মামলায় বাদি ইউসুফ আমিন অভিযোগ করেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার ৩ পুত্র সাইফুল্লাহ, মারুফ ও হুজাইফাসহ অজ্ঞাত আরো ৮/১০ জন মিলে গত ২৬ ফেব্রুয়ারী তাদের মালিকানাধীন জমিতে অনাধিকার প্রবেশ করে বাউন্ডারী দেওয়াল ভাঙচুর করে। এসময় তার বড় ভাই আব্দুর রহমান ও আব্দুর রহিম উপস্থিত হয়ে বাধা দিলে তাদেরকে খুন করার উদ্দেশ্যে লোহার রড ও কাঠের ডাসা দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং এলোপাথারি মারধর করে ও শ^াসরোধে হত্যার চেষ্টা করে। এসময় তাদের কাছে থাকা নাভা বাটন মোবাইল যার আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং নগদ ৫ হাজার টাকা ও টাইটান ঘড়ি যার আনুমানিক মূল্য ১১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়া নেয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে বেআইনী জনতাবদ্ধে অনাধিকার প্রবেশ করত: হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে সাধারণ ও গুরুত্বর জখম, চুরি, ক্ষতিসাধন ও প্রাণনাশের হুমকী প্রদর্শনের অপরাধ। চোরাইমূল্য ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং ক্ষতিসাধণ উল্লেখ করা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা। ঘটনা গত ২৬ ফেব্রুয়ারী হলেও ৩ দিন পরে মামলাটি রেকর্ড দেখানো হয় ১ মার্চ রাত পৌনে ১টার সময়ে। কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার পুত্র হুজাইফাকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের এসআই ফরহাদ ও তার সঙ্গীয় ফোর্স। একপ্রকার টেনে হিচড়ে তাদেরকে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে বাসা থেকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ যার প্রত্যক্ষদর্শী ওই এলাকার শত শত মানুষ। ১ মার্চ সোমবার বিকেলে মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার পুত্র হুজাইফাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়।

এদিকে মাওলানা আব্দুর রহিমের স্বজনেরা জানান, গত শুক্রবার ২৬ ফেব্রুয়ারী সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্টজনের পালিত ক্যাডাররা জমিটি দখলের পায়তারা চালায়। এর আগেও সন্ত্রাসী কায়দায় একাধিকবার সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়। জমি দখলের চেষ্টায় বাধা প্রদান করায় পিতা আব্দুর রহিম ও পুত্র হুজাইফাকে মারধর করে ভূমিদস্যুদের পালিত স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে সন্ত্রাসীরা জমির মালিক মাওলানা আব্দুর রহিমের পুত্র হোজাইফার মাথা ফাটিয়ে দেয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মাওলানা আব্দুর রহিম ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়েরের উদ্দেশ্যে অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে বলে অভিযোগে জানা গেছে। বরং মাওলানা আব্দুর রহিম ও তার পুত্রের সঙ্গে অসদাচরণ করেন ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুর রহমান।

এর আগে সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত জমির মালিক মাওলানা আব্দুর রহিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, শহরের চাষাঢ়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় খরিদা সূত্রে তিনি ১২ শতাংশ জমির মালিক। তার জমিটি চাষাঢ়া মৌজায় ২৪ নং দাগে অবস্থিত। তার জায়গার পার্শ্ববর্তী জায়গার মালিক আব্দুর রহিম ও ইউসুফ আমিন যাদের জায়গাটি ইসদাইর মৌজায় ১০৯ নম্বর দাগে। দু’টি জমির দাগ ভিন্ন মৌজা ও ভিন্ন দাগে হওয়া সত্বেও আব্দুর রহিম ও ইউসুফ আমিন সহোদর দীর্ঘদিন ধরেই মাওলানা আব্দুর রহিমের পৌনে ২ শতাংশ জমি নিজের দাবি করে দখলের চেষ্টা করে আসছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার বিচার শালিস হয়ে আসলেও কোন কিছুই মানতে নারাজ প্রভাবশালী দুই সহোদর আব্দুর রহিম ও ইউসুফ আমিন। নিজেকে রাইফেল ক্লাবের মেম্বার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের একজন জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ট বন্ধু পরিচয় দিয়ে বেড়ান আব্দুর রহিম। ওই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ ২য় আদালতে মাওলানা আব্দুর রহিম বাদি হয়ে ইউসুফ আমিন গংদের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়ের করেন যার নং ৩১৩/২০১৯। ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তার জমিতে অবৈধভাবে প্রবেশ করে ওই জমিতে লাগানো বিপুল পরিমাণ ফলদ গাছ কেটে ফেলে। পাশাপাশি জমি দখলের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ইট, বালু ও সিমেন্ট এনে জমিতে জড়ো করা হয়। ওই ঘটনাতেও ফতুল্লা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বরও ফতুল্লা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। গেল বছরেও একাধিকবার দখল চেষ্টা করা হয়। ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ দ্বিতীয় আদালত আসাদুজ্জামান লিটনকে কমিশনার নিয়োগ করেন। নিয়োগকৃত কমিশনারকে উভয়পক্ষকে নোটিশ দিয়ে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে তদন্তপূর্বক ধার্য্য তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন আদালত। তবে বিবাদী ইউসুফ আমিন গংরা সরেজমিনে তদন্ত হলে পরাজিত হবেন এ আশঙ্কায় আদালতে আপিল করে সরেজমিনে তদন্ত স্থগিত রেখেছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী জমি দখলের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ইট, বালু ও সিমেন্ট এনে জমিতে জড়ো করা হয়। এ ঘটনায় জমির মালিক মাওলানা আব্দুর রহিমের পুত্র খালেদ সাইফুল্লাহ ফতুল্লা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে ১৩ ফেব্রুয়ারী শনিবার সকালে দখল চেষ্টাকারীদের পক্ষে দেয়াল নির্মাণ করতে চাইলে খালেদ সাইফুল্লাহ বাধা প্রদান করেন। এসময় তাকে মারধর করে দখল চেষ্টাকারীরা। পরে জমির মালিকের অভিযোগ পেয়ে শনিবার ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে এসে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করে।

ওই ঘটনার দুই সপ্তাহ পরে ২৬ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে আবারো ১৫-১৬ জনের একটি ক্যাডার বাহিনী জমি দখলের চেষ্টা চালায়। তারা জমি দখলের উদ্দেশ্যে ইট, বালু ও সিমেন্ট এনে জমিতে জড়ো করে দেওয়াল নির্মাণের চেষ্টা চালালে জমির মালিক মাওলানা আব্দুর রহিম বাধা প্রদান করেন। এসময় সন্ত্রাসীরা মাওলানা আব্দুর রহিমকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে তার পুত্র মো: হোজাইফা বাধা প্রদান করে। তখন সন্ত্রাসীরা পুত্র মো: হোজাইফাকে বেধড়ক মারধর করে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। পরে পিতা পুত্রের আর্তচিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে মাওলানা আব্দুর রহিম এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

মাওলানা আব্দুর রহিমের অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড না হলেও প্রতিপক্ষ ইউসুফ আমিনের মামলাটি রোববার দিনগত গভীর রাত পৌনে ১টায় রেকর্ড দেখিয়েছেন ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। পরে দুপুরে মাওলানা আব্দুর রহিমের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে ও তার পুত্র হুজাইফাকে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় পুলিশ।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার এসআই ফরহাদ জানান, তিনি সোমবার সকালে মামলার কাগজ হাতে পান। দুপুরে মামলার আসামীদের গ্রেফতারে অভিযানে গিয়েছিলেন। তখন মামলার ৪নং আসামী তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে গ্রেফতারে বাধা দিয়েছিল। তখন কিছুটা টানা হেচড়া হয়েছে। পরে আসামীদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেলে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধে আহতরা থানায় মামলার আবেদন করেছে। তারা হাসপাতালের সার্টিফিকেটসহ জমা দিয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতেই আসামীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মামলাটি রেকর্ড করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

মাওলানা আব্দুর রহিমের অভিযোগ কেন তদন্ত করা হলোনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিবাদীরা অভিযোগ দিয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও