বল পায়ে মাঠে ফিরলো নিপু

সোহেল রানা,স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৩ পিএম, ২২ আগস্ট ২০২০ শনিবার

বল পায়ে মাঠে ফিরলো নিপু

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস ক্ষুদে ফুটবলার নিপুর স্বপ্ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল। কারণ করোনার ছোবলে নিপুর দরিদ্র পরিবারেকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল দারিদ্রতা। পরিবারের সেই দারিদ্রতা কাটাতে খেলার মাঠ ছেড়ে হোসিয়ারী শ্রমিক হিসেবে কাজ নিতে হয় বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা জাহিদ হাসান নিপুকে। তবে নিপুর ভাঙ্গা স্বপ্ন আরো সুন্দর করতে দেবদূত হয়ে নিপুর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন লিপি ওসমান। সেই সহায়তায় প্রাণ ফিরে পায় নিপুর স্বপ্ন। হোসিয়ারীর কর্মজীবন ত্যাগ করে নিজের স্বপ্ন পূরণে আবারো মাঠে ফিরবে নিপু।

ডানপিটে স্বভাবের নিপুর প্রিয় খেলা ফুটবল। বন্ধুদের সাথে স্টেডিয়ামে ঘুরতে গিয়ে যেদিন দেখে অনেক খেলোয়াড় ফুটবল প্র্যাক্টিস করছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। বাড়িতে এসে বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে পরের দিন থেকেই শুরু করে ফুটবল প্র্যাক্টিস। এর মাত্র এক বছরের মাথায় গত বছরের ২৮ মে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফুটবলের ফাইনাল উপলক্ষ্যে গ্যাজপ্রেমের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী ক্ষুদে ফুটবলারদের উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য আয়োজিত বাছাই পর্বে অনুর্ধ্ব-১২ ফুটবলারদের মধ্যে দেশ সেরা মিডফিল্ডার নির্বাচিত হয়েছিল জাহিদ হাসান নিপু। কিন্তু প্রাণঘাতি করোনা তাঁর দ্ররিদ্র পরিবারকে আরো কোণঠাসা করে জেঁকে বসে। যে কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বয়স ভিত্তিক দেশ সেরা এই মিড ফিল্ডারকে কাজ নিতে হয়েছিল একটি হোসিয়ারী কারখানায়।

তবে এখন আর নিপুকে তাঁর স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে না। মাঠ ছেড়ে হোসিয়ারীর শ্রমিক হিসেবে আর কাজ করতে হবে না। নারায়ণগঞ্জ মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের সহধর্মিনী লিপি ওসমানের ওর স্বপ্ন পূরণের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। লিপু আবারো মাঠে যাবে। ফুটবল নিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে বহুদূর।

নিপু এখন আবার মাঠে ফিরবে। ফুটবলকে তাঁড়া করে নিজের স্বপ্নের পিছনে ছুটবে। আজ বিকেলে যখন এই আশ^াস নিপু শুনতে পায়। তখন তাঁর চোখে মাঠে ফেরার উচ্ছাস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আর্থিক সহায়তা নিয়ে যখন তাঁর বাড়িতে হাজির হয় জয় বাংলা ক্লাবের সভাপতি ওয়াদ্রিব আহমেদ অন্তর। তখনর থেকেই তাঁর ঠোঁটে মুচকি হাঁসি জলজল করছিল। এ জেন হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আবারো ফিরে পাওয়া।

‘আবারো মাঠে ফিরবে নিপু। কেমন লাগছে?’ এমন প্রশ্নে একগাল হাসি দিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে নিপু বলে, ‘খুব ভালো লাগছে! আমি আবার মাঠে প্র্যাক্টিস করতে যাবো। আবার ফুটবল খেলতে পারব। এটা ভাবতেই আমার আনন্দ লাগছে। আমার খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লিপি ওসমান আন্টি আবার সুযোগ করে দিয়েছেন এ জন্য আন্টিকে ধন্যবাদ জানাই।’

ছেলের স্বপ্ন একদিন বড় ফুটবলার হবে। দেশের হয়ে খেলবে, দেশের জন্য কিছু করবে। কিন্তু পরিবারের দারিদ্রতার কারণে কিশোর বয়সেই সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে যেতে থাকে। এই দুঃখ যতটা নিপুকে কাঁদায় ঠিক ততটাই কাঁদিয়েছে নিপুর বাবা সেলিম হোসেন ও মা আসমা বেগমকে। কারণ খেলার প্রতি ছেলের আগ্রহ ও ফুটবলে ওর সাফল্য দেখে দারিদ্রতার মধ্যেও নিপুর খেলা চালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। নিপুর স্পেনে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার খবর শুনে ক্ষুদ্র ব্যসায়ের জন্য ঋণ নেওয়া অর্থ পুরোটাই ওর পেছনে খরচ করেছিলেন বাবা সেলিম হোসেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও দারিদ্রতার কাছে হার মানতে হয়েছিল সেলিম হোসেন ও আসমা বেগমকে। এখন যখন আবার মাঠে ফিরবে নিপু তখন আনন্দিত তাঁরাও।

নিউজ নারায়ণগঞ্জকে সেলিম হোসেন বলেন, ‘আমার পরিবারের অবস্থা খারাপ ছিল। যে কারণে নিপুকে হোসিয়ারীতে কাজে দিতে হয়। কিন্তু লিপি ওসমান তিনি আমাদের খোঁজ পেয়ে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এতে আমার যে আর্থিক সংকট ছিল। সেটা দূর হয়েছে। এ জন্য আমি তাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ। নিপুকে আবার পড়ালেখা এবং খেলার সুযোগ করে দেওয়ায় আমরা এখন অনেক খুশি।’

নিপুকে যেদিন প্রথম স্টেডিয়ামে খেলতে দেখেছিলেন কোচ খলিলুর রহমান দোলন। সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিপু হচ্ছে একজন গড গিফটেড ফুটবলার। একজন পরিপূর্ণ ফুটবলার হিসেবেই নিপু জন্মগ্রহণ করেছে। ওর পেছনে সময় দিতে পারলে একদিন জাতীয় দলে খেলতে পারবে এবং ভালো কিছু করতে পারবে। যে কারণে প্রথম দিকেই নিপুকে তাঁর একাডেমীর অনুর্ধ্ব-১২ দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে মাঠে নামান তিনি। কোচের আস্থার ষোল আনাই রেখেছে নিপু। যে ৫টি টুর্নামেন্টে নিপু ক্যাপ্টেন হিসেবে খেলেছে। প্রতিটিতেই চ্যাম্পিয়নের খেতাব অর্জন করেছে তাঁর দল।

নিপুর এমন প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে শুরু থেকেই নিপুর প্রায় সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিলেন কোচ খলিলুর রহমান দোলন। নিপুর জার্সি, বুট থেকে শুরু করে আনুসাঙ্গিক প্রায় সব কিছুই তিনি নিজ অর্থায়নে কিনে দিতেন। এছাড়া নিপুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ওকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছিলেন তিনিই। তবে করোনা যখন হানা দেয় তখন তাঁর পরিবারের অবস্থাও খুব ভালো ছিল না। যে কারণে নিপুর হোসিয়ারীতে কাজ নেওয়ার কথা শোনার পর একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় হারানোর আক্ষেপ ছাড়া কিছুই করার ছিল না তাঁর।

তবে যখন তিনি শুনলেন যে লিপি ওসমানের সহায়তায় নিপু আবারো মাঠে ফিরবে। তখন অসংখ্য ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। সেই সাথে নিউজ নারায়ণগঞ্জ পত্রিকায় নিপুর সংবাদটি প্রকাশ করায় নিউজ নারায়ণগঞ্জ পরিবারের প্রতি অসংখ্য ধন্যবাদ ও চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও কোচ খলিলুর রহমান দোলন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জকে তিনি বলেন, ‘লিপি আপাকে ধন্যবাদ না জানলেই নয়। ক্রীড়াঙ্গণে তিনি সবাইকে সহযোগীতা করে ইতোমধ্যেই তিনি মানবতার জননী হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। এর আগেও আমার প্লেয়ার আরিফের সমস্যা সমাধানে ডেকে নিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। এভাবেই তিনি একে একে সবাইকে সহযোগীতা করছেন। সে জন্য আমি ক্রীড়াঙ্গণের পক্ষ থেকে, ফুটবলারদেরন পক্ষ থেকে লিপি আপার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘লিপি আপার দৃষ্টিগোচর হয়েছে নিউজ নারায়ণগঞ্জে প্রকাশিত সংবাদের কারণে। তাই আমি নিউজ নারায়ণগঞ্জ পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

২১ আগস্ট শুক্রবার বিকেলে লিপি ওসমানের পক্ষ থেকে ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইরে অবস্থিত নিপুর বাড়িতে গিয়ে নিপুর বাবা সেলিম হোসেন ও ফুটবলার জাহিদ হাসান নিপুর হাতে নগদ ৩০ হাজার টাকার নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন জয় বাংলা ক্লাবের সভাপতি ওয়াদ্রিব আহমেদ অন্তর।


বিভাগ : খেলাধুলা


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও