দুই ফুটবলারকে মাঠে ফেরালেন লিপি ওসমান

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৪ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২০ শনিবার

দুই ফুটবলারকে মাঠে ফেরালেন লিপি ওসমান

প্রায় এক দশক ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা নারায়ণগঞ্জের ফুটবলে শেষ ছোবলটা বসায় প্রাণঘাতি করোনা। যে ছোবলে অনেক খেলোয়াড়কে সংসার চালাতে মাঠ ছেড়ে কাজ নিতে হয়। এমন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জের উদীয়মান দুইজন ফুটবলারের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার। একজনকে রাজমিস্ত্রীর যোগালি অন্যজনকে হোসিয়ারীর হেলপারের কাজ নিতে হয়। তবে দুইজনকেই মাঠে ফিরে এনেছেন নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদের চেয়ারম্যান সালমা ওসমান লিপি।

যে দুই ফুটবলারের কথা হচ্ছিল তাঁদের একজন বাংলাদেশ পেশাদার ফুটবল লীগে মাঠ কাপানো স্ট্রাইকার আরিফ হাওলাদার। ২০১৯ সালে আড়াই লাখ টাকা বাৎসরিক চুক্তিতে চ্যাম্পিয়নস লিগ অগ্রণী ব্যাংক, ২০১৭-১৮ মৌসুমে ৬ লাখ টাকায় শেখ জামাল টিমে, ২০১৬ সাল ৩ লাখ টাকা আরামবাগ কেসি ও ২০১৫ বি লিগ বিজেএমসিতে আড়াই লাখ টাকা চুক্তিতে টিমে সুযোগ পায় আরিফ। কিন্তু প্রাণঘাতি করোনায় অর্থ সংকটে পড়া আরিফের পরিবারের হাল ধরতে দৈনিক মাত্র ৪০০ টাকার মজুরিতে কাজ রাজ মিস্ত্রীর যোগালির কাজ নিতে হয় আরিফকে।

অপরজন হচ্ছে ১৩ বছরের ক্ষুদে ফুটবলার জাহিদ হাসান নিপু। গত বছরের ২৮ মে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফুটবলের ফাইনাল উপলক্ষ্যে গ্যাজপ্রেমের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী ক্ষুদে ফুটবলারদের উৎসবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল নিপুর। সেই বাছাই পর্বে অনুর্ধ্ব-১২ ফুটবলারদের মধ্যে দেশ সেরা মিডফিল্ডার নির্বাচিত হয়েছিল জাহিদ হাসান নিপু। কিন্তু প্রাণঘতি করোনার কারণে নারায়ণগঞ্জের এই ক্ষুদে ফুটবলারের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার। মাত্র ৫ হাজার টাকায় হোসিয়ারীর হেলপারের কাজ নিতে হয় নিপুকে।

প্রাণঘাতি করোনার আঘাতে যখন নারায়ণগঞ্জের ফুটবলারদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। ঠিক সেই সময়ে ক্রীড়াঙ্গণের প্রাণদাতা হিসেবে হাজির হন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের সহধর্মিনী ও নারায়ণগঞ্জ মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সালমা ওসমান লিপি। এই দুইজন ফুটবলারকে মাঠে ফেরাতে তৎপর হয়ে ওঠেত তিনি। ফুটবলার আরিফের পরিবারের জন্য নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং নিপুর পরিবারকে ৩০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা করে তাদেরকে আবারো মাঠে ফিরিয়ে আনেন। সালমা ওসমান লিপির সহায়তায় আরিফ ও নিপু দুইজনই এখন ফুটবল পায়ে আবারো মাঠে ফিরেছে।

ক্ষুদে ফুটবলার নিপুর হোসিয়ারীতে কাজ নেওয়ার সংবাদ ‘নিউজ নারায়ণগঞ্জ টোয়েন্টিফোর ডট নিউজ’ এ প্রকাশ পাওয়ার পর নিজেই খোঁজ নিয়ে নিপুর পরিবারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন লিপি ওসমান। নিপুর পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা করে আবারো নিপু, নিপুর বাবা এবং নিপুর ফুটবল কোচের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

এসময় নিপুর বাবাকে তিনি বলেন, ‘আপনার বাড়ি ভাড়ার জন্য টাকা দিয়েছি সেই টাকাটা রাখেন। আর ছেলেটা যেহেতু ভালো ফুটবল খেলে ওকে খেলতে পাঠান। ওকে স্কুলে পাঠান। আর ও যেহেতু ফুটবল ভালো পারে ফুটবল খেলায় ওর ভবিষ্যৎ আছে তাই ওকে ফুটবল খেলতে দেন।’

নিপুকে তিনি বলেন, ‘তোমার পড়ালেখা চালিয়ে যাও আর ফুটবল প্রাক্টিস চালিয়ে যাও। তোমার ইন্টারভিউতে আমি শুনেছি যে তোমার ঘর ভাড়ার জন্য তুমি কাজ করো। আপাতত ৭ মাসের ভাড়া আমি দিয়ে দিয়েছি। তাই ভালো করে মন দিয়ে তুমি পড়াখেলা করো আর খেলা চালিয়ে যাও। এই দুইটিতেই তোমার ভবিষ্যৎ হয়ে যাবে। আমি তোমার জন্য দোয়া করি।’

কোচ খলিলুর রহমান দোলনকে লিপি ওসমান বলেন, ‘ছেলেটি নাকি ভালো খেলে। ওর যেহেতু খেলাটা প্যাশন তাই ও খেলুক। আর ওর পড়ালেখাটাও চালিয়ে যেতে বলো। তুমি ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো।’

নিপুর মত ফুটবলার আরিফের সংবাদ যখন প্রাচারিত হয় তখনও তিনি বসে থাকতে পারেননি। সংবাদ দেখেই নিপুর খোঁজ নেন তিনি। আরিফকে আবার মাঠে ফেরাতে আরিফের পরিবারকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিপি ওসমান জানিয়েছিলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জন্য শিক্ষণীয় যে আরিফ কারো কাছে হাত না পেতে বাবা ও পরিবার চালাতে জোগালির কাজ বেছে নিয়েছে। এমন সন্তান জাতির জন্য গর্বের। আজকে যেখানে বিভিন্ন স্থানে খবর পাওয়া যায় বৃদ্ধ বাবাকে কিছু সন্তানরা রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে, সেখানে আরিফ বাবা মায়ের জন্য জোগালি করতে দ্বিধাবোধ করেনি। তাকে সম্মান জানাই।’

তিনি আরও জানান, ‘ওর জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি এটা প্রচারের জন্য নয়। আল্লাহ যেন এই অনুদানকে কবুল করেন। ইতোমধ্যে ওর জন্য এমপি শামীম ওসমান একটি ফুটবল ক্লাব যোগাড় অথবা একটি চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমি সবাইকে আহ্বান জানাব এ রকম একটি ব্যক্তিত্ববান ছেলের পাশে দাঁড়াতে।’

করোনার থাবায় মাঠ ছাড়া হওয়া যে দুইজন ফুটবলারকে তিনি মাঠে ফিরিয়ে এনেছেন তাঁরা দুইজনই নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও কোচ খলিলুর রহমান দোলনের একাডেমীর খেলোয়াড়। এই ফুটবলাররা যখন অর্থ সংকটে পড়ে মাঠ ছেড়ে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিল তখন নারায়ণগঞ্জে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গণকে রক্ষায় লিপি ওসমানের তৎপরতায় আশার আলো দেখছেন তিনি। ফুটবলের প্রতি, অসহায় খেলোয়াড়দের রক্ষায় এগিয়ে আসায় লিপি ওসমানকে তিনি ‘মানবতার জননী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জকে খলিলুর রহমান দোলন বলেন, ‘লিপি আপাকে ধন্যবাদ না জানলেই নয়। ক্রীড়াঙ্গণে তিনি সবাইকে সহযোগীতা করে ইতোমধ্যেই তিনি মানবতার জননী হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। এর আগেও আমার প্লেয়ার আরিফের সমস্যা সমাধানে ডেকে নিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। এভাবেই তিনি একে একে সবাইকে সহযোগীতা করছেন। সে জন্য আমি ক্রীড়াঙ্গণের পক্ষ থেকে, ফুটবলারদেরন পক্ষ থেকে লিপি আপার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’


বিভাগ : খেলাধুলা


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও